ইরান যুদ্ধের মধ্যেও কেন কমছে স্বর্ণের দাম

গোল্ড বার
বিদেশে এখন
1

বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম (Gold Price) বেড়ে যায়। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধ (Gold Price Drop During Iran War) শুরুর পর এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম চাপে রয়েছে। ২৮ জানুয়ারি ট্রয় আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৩০৩ ডলারের উচ্চতা থেকে গত শুক্রবার (১২ জুন) তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ উঠে এসেছে।

স্বর্ণের দাম কমার পেছনে মূল কারণ: বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও সুদহার (Why Gold Prices are Falling: Inflation & Interest Rate Factor)

বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি (Inflation) বেড়ে যাওয়া এবং সেই কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত সুদহার কমাবে (Interest Rate Cut)—এই প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়া। উল্টো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে (Inflation Control) সুদহার আরও বাড়তেও পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে স্বর্ণের মতো সম্পদের ওপর চাপ বেড়েছে।

আরও পড়ুন:

হরমুজ প্রণালি সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে প্রভাব (Impact of Strait of Hormuz Crisis on Fuel Prices)

এই মূল্যস্ফীতির বড় একটি উৎস হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz)। যুদ্ধের জবাবে ইরান এই জলপথে চলাচলে বাধা দেয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম (Fuel Price) বেড়েছে, আর সেই প্রভাব গিয়ে পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখন তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজার (Labor Market) স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক সুদহার কমার আশা আরও কমেছে।

স্বর্ণ বনাম ডলারের লড়াই ও উচ্চ সুদহারের প্রভাব (Gold vs US Dollar: High Interest Rate Impact on Safe Haven Assets)

স্বর্ণ মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা (Inflation Hedge) হিসেবে বিবেচিত হলেও উচ্চ সুদহার সাধারণত এর জন্য নেতিবাচক। কারণ, স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ যেখান থেকে নিয়মিত আয় আসে না। এর দাম বাড়লেই কেবল বিনিয়োগকারী লাভবান হন। এ কারণে সুদহার বেশি থাকলে ডলারভিত্তিক বিনিয়োগ (Dollar Investment) অন্যান্য আয়মুখী বিনিয়োগ অনেকের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আর্থিক বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, ‘স্বর্ণ তখনই বিনিয়োগ হিসেবে আকর্ষণ হারায়, যখন সুদহার বেশি থাকে এবং মানুষ ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।’

আরও পড়ুন:

শক্তিশালী ডলার ও মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত (Strong US Dollar & US Federal Reserve Next Move)

বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, ইরান যুদ্ধ ডলারকে শক্তিশালী (Strong Dollar) করেছে। আর যেহেতু স্বর্ণের আন্তর্জাতিক দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই সাধারণত ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের ওপর চাপ পড়ে। নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কলিন প্লুম বলেন, ‘ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণ চাপের মুখে পড়ে, ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম সাধারণত বাড়ে।’ তার ভাষায়, ২০২৬ সালে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও সুদহার—দুই চাপই কাজ করছে, আর এখন সুদহারের দিকটাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে (Federal Reserve) সুদহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিএমই ফেডওয়াচ টুলের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা (Interest Rate Hike) এখন ৫০ শতাংশের বেশি। এই প্রত্যাশাও স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করছে।

ইরান-আমেরিকা সমঝোতার আভাস এবং স্বর্ণের বাজারের ভবিষ্যৎ (US-Iran Truce Talks & Future of Gold Price Trends)

তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতার খবর আসার পর স্বর্ণের দাম (Gold Rate Today) আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে বন্ধ হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ শেষের দিকে গেলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে পারে, যা স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু সেই প্রভাব দেখা দিতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি আরও বেশ কিছু উপাদান স্বর্ণের দামে বড় উল্লম্ফন ঠেকিয়ে রাখতে পারে।

আরও পড়ুন:

ইরান যুদ্ধের মধ্যেও কেন কমছে স্বর্ণের দাম

একনজরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং স্বর্ণের বাজারে প্রভাবের মূল কারণসমূহ

মূল নিয়ামক (Key Factors) বাজারের ওপর প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি (Market Impact & Situation)
আন্তর্জাতিক বাজার দর (International Market Price) গত ২৮ জানুয়ারি ট্রয় আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম ৫,৩০৩ ডলারের উচ্চতায় পৌঁছালেও গতকাল (১২ জুন) তা কমে ৪,২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে। যুদ্ধাবস্থাতেও স্বর্ণের বাজার বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহার (Inflation & Interest Rates) বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দ্রুত সুদহার কমানোর প্রত্যাশা দুর্বল হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার আরও বাড়ার আশঙ্কায় স্বর্ণের মতো অ-আয়মুখী (Non-yielding) সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি সংকট (Strait of Hormuz Crisis) ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বাধা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ (৪.২%) স্তরে পৌঁছেছে।
শক্তিশালী মার্কিন ডলার (Strong US Dollar) ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে মার্কিন ডলারের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হওয়ায়, ডলার শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে স্বর্ণের দাম স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাচ্ছে।
ফেডারেল রিজার্ভের অবস্থান (US Federal Reserve Policy) সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক সুদহার আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন ৫০%-এর বেশি। এই পূর্বাভাস স্বর্ণের বাজারকে আরও বেশি মন্দাগ্রস্ত করে তুলেছে।
সমঝোতার আভাস ও ভবিষ্যৎ (Truce Talks & Future Outlook) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে শুক্রবার স্বর্ণের দাম সাময়িকভাবে কিছুটা বেড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটলে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে, তবে স্বর্ণের দামে বড় কোনো উল্লম্ফন দেখা দিতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

এএম