ইউরোপজুড়ে ‘ওমেগা’ তাপপ্রবাহ; রেকর্ড গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন, মৃত অর্ধশতাধিক

ইউরোপজুড়ে ওমেগা হিট ওয়েব চলছে
বিদেশে এখন
0

প্রাণঘাতী ‘ওমেগা’ তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে পশ্চিম ইউরোপ। গত আজ (বুধবার, ২৪ জুন) তীব্র এই গরমে তাপমাত্রার আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। নজিরবিহীন এই গরমে এরই মধ্যে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া স্কুল বন্ধ ঘোষণা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং খামারে লাখো হাঁস-মুরগির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে গত প্রায় ৮০ বছরের মধ্যে গতকাল (মঙ্গলবার, ২৩ জুন) সবচেয়ে উষ্ণ দিন রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পিসোস শহরের তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রিটানি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে হাজারো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে যায়, যা মেরামতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। গরমে স্বস্তি পেতে পানিতে নেমে ফ্রান্সে অন্তত ৪৮ জন ডুবে মারা গেছেন। এছাড়া একটি তপ্ত গাড়ির ভেতর আটকে পড়ে মারা গেছে দুই শিশু। এদিকে ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফ্লোরেন্স, মিলান, রোম, তুরিন ও ভেরোনাসহ ১৬টি শহরের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

ব্রিটেনে জুনের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। তীব্র গরমে সুস্থ মানুষেরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কায় শত শত স্কুল পুরোপুরি বন্ধ বা আগেভাগেই ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। স্পেনেও সপ্তাহান্ত থেকে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে এবং হিটস্ট্রোকে দুই বয়স্ক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা এএমইটি জানিয়েছে, সোমবার ও মঙ্গলবার ছিল জুনের শেষভাগের সবচেয়ে উষ্ণ দিন। তবে আজ (বুধবার, ২৪ জুন) থেকে সেখানে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে।

ফরাসি কৃষি সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তীব্র গরমে ব্রিটানি ও পেইস দে লা লোয়ার অঞ্চলের খামারগুলোতে লাখো হাঁস-মুরগি মারা গেছে। মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দেয়ার আগে তরল শুষে নিতে কৃষকদের কাঠের গুঁড়ো ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত যাচাইয়ের পরই কেবল এগুলোকে খামারে মাটিচাপা দেয়া যাবে। চুল্লি ঠান্ডা করার পানির অভাব দেখা দেয়ায় ফ্রান্সে বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে।

রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ‘ওমেগা ব্লক’ নামের এক বিরল আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’-এর মতো আকৃতির এই ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম আটকে থাকে এবং এর প্রান্তে অপেক্ষাকৃত শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে। ফরাসি আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, বর্তমান এই পরিস্থিতি ২০০৩ সালের আগস্টের তাপপ্রবাহের সঙ্গে তুলনীয়, যা ১৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল এবং পুরো ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপে দ্বিগুণ গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে।

গরমের কারণে আইফেল টাওয়ার আগেভাগেই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। বাকিংহাম প্যালেসের বাইরে লাল পোশাক ও ভারী ভালুকের চামড়ার টুপি পরা প্রহরীদের ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজও সীমিত করা হয়েছে। প্যারিস ফ্যাশন উইকেও গরমের প্রভাব পড়েছে। লুই ভিতোঁর শো-তে দর্শকদের ঘামতে ও হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে। ডিওর ও রিক ওয়েন্সের মতো ব্র্যান্ডগুলো তাদের শো সকালে নিয়ে এসেছে। জার্মানির মিউনিখের বামবারগার হাউস বিয়ার গার্ডেনের ব্যবস্থাপক সাশা মেয়ার জানান, তাদের খাবার পরিবেশনের জায়গায় তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, ফ্যান চালিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।’

নেদারল্যান্ডসে চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সেখানে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কায় আউটডোর খেলাধুলা বাতিল করা হয়েছে, গণপরিবহন কমানো হয়েছে এবং স্কুলগুলো বন্ধ বা ক্লাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে সাধারণ মানুষের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থিয়েটারগুলো বিনা মূল্যে খুলে দেয়া হয়েছে। পুরো ইউরোপজুড়েই নির্মাণ শ্রমিকদের কাজের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। ফরাসি একটি কৃষি সমবায় জানিয়েছে, বিকেলের তীব্র গরম থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করতে এবং খেতগুলোকে অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচাতে কৃষকেরা রাতে ফসল তোলার কাজ করছেন।

ফ্যান ও পোর্টেবল এসির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে খুচরা বিক্রেতারা। ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় সুপারমার্কেট চেইন টেসকো জানিয়েছে, এ সপ্তাহে সানস্ক্রিন বিক্রি ৭২ শতাংশ এবং আইসক্রিম বিক্রি ৪৮ শতাংশ বাড়বে বলে তারা ধারণা করছে। ইতালির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী রোববার ও সোমবারের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তুসকানি ও এমিলিয়ার মধ্যে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে, আর লিগুরিয়ার মতো উপকূলীয় এলাকায় গরম ও চরম আর্দ্রতার কারণে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অনুভূত হতে পারে।

এত গরমের পরও বুধবার ভ্যাটিকানের জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য কড়া রোদে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায় পর্যটকদের। অনেকেই ছাতা বা হাতপাখা ব্যবহার করছিলেন, কেউ কেউ আবার মাথা বাঁচাতে টি-শার্ট পেঁচিয়ে নিয়েছিলেন। ডমিনিকান রিপাবলিক থেকে আসা ফাদার ইসরায়েল হাতে এক গ্লাস বিয়ার নিয়ে বলেন, ‘আমরা বিয়ার চাই, গরম থেকে বাঁচতে একটা বিয়ার চাই।’

এএম