উপনির্বাচনে জিতলেন ফারাজ; পাল্টা লড়াইয়ে চমক দেখালো ‘কাউন্ট বিনফেস’

ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ
বিদেশে এখন
1

নিজে থেকেই ডাকা উপনির্বাচনে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে জয় পেয়েছেন রিফর্ম ইউকে-এর নেতা নাইজেল ফারাজ। শুক্রবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জয়ী হলেও সমালোচকদের নীরব করার তার কৌশল উল্টো ফল বয়ে এনেছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘কাউন্ট বিনফেস’ পরিচয়ে ময়লার বাক্সের পোশাক পরে দাঁড়ানো এক কৌতুক অভিনেতা মোট ভোটের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পেয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান ব্রেক্সিটপন্থি নেতা ফারাজ অত্যন্ত অস্বাভাবিকভাবে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট শহর ক্ল্যাক্টনে ভোট গণনার স্থানে উপস্থিত হননি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, পুলিশ তাকে জানিয়েছে যে ফলাফল ব্যাহত করার জন্য একটি প্রচারণা চলছে। শুক্রবার শেষে দেয়ার কথা থাকা তার বিজয়ী ভাষণও তিনি বাতিল করেন।

ফলাফল ঘোষণার আগে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে ফারাজ বলেন, ‘দারুণভাবে বিজয়ী হয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে এসব সাধারণ ব্যক্তিদের হাতে অপমানিত ও লজ্জিত হতে যাচ্ছি না, এটি হতেই পারে না।’

গত মাসে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেছিলেন ফারাজ। ভোটারদের কাছ থেকে নতুন করে ম্যান্ডেট আদায় করার জন্যই এই উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করেন তিনি। ফারাজের ভাষায়, এটি ছিল সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার লড়াই, যেটি তার আর্থিক বিষয় নিয়ে অভিযোগ তুলে তাকে বদনাম করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

জয়ী হলেও ফলাফলটি ফারাজের এই বাজির রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকটি স্পষ্ট করেছে। দাতাদের কাছ থেকে ঘোষণা না দেয়া উপহার নেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের তদন্ত আবার শুরু হচ্ছে। ফলে এই ভোটে তিনি যে হুমকি দূর করতে চেয়েছিলেন, তা কার্যত এখনো বহাল রয়েছে।

রিফর্মের গতি হারানোর ইঙ্গিত
ব্রিটেনের প্রধান দলগুলো এই নির্বাচনকে ‘নিজের স্বার্থ পূরণের চটকদার আয়োজন’ বলে অভিহিত করে সরে দাঁড়ায়। এতে ফারাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন ‘কাউন্ট বিনফেস’ নামের এক কাল্পনিক চরিত্র। কৌতুক অভিনেতা জোনাথন হার্ভির তৈরি এই চরিত্রটি ব্রিটিশ নির্বাচনে হাসি-ঠাট্টার এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছে।

চূড়ান্ত ফলাফলে ফারাজ পেয়েছেন ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে কাউন্ট বিনফেস পেয়েছেন ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। ভোটদানের হার ছিল ৪৪ শতাংশ। আইসক্রিম কোনের দামের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেয়া এবং গণপরিবহনে স্পিকারফোন ব্যবহারকারীদের বাধ্যতামূলক সেবায় নিয়োগ দেয়ার মতো নীতি ছিল কাউন্ট বিনফেসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে।

জাতীয় জনমত জরিপে দীর্ঘদিন এগিয়ে থাকার পর রিফর্ম পার্টির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। এর পেছনে ফারাজের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অভিযোগ অন্যতম কারণ। বিলিয়নিয়ার ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ৫০ লাখ পাউন্ড (৬৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার) উপহার নেয়ার বিষয়টি ঘোষণা করা উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

লন্ডনের বার্কবেক ইউনিভার্সিটির রাজনীতির প্রভাষক লরা রিচার্ডস-গ্রে বলেন, প্রধান দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ফারাজের ‘জনগণ বনাম প্রতিষ্ঠানের’ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত করার চেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার ভাষ্য, ‘এই কৌশল হিতে বিপরীত হয়েছে। বিশেষত জাতীয়ভাবে, কারণ ফারাজ পুরো বিষয়ের ন্যারেটিভের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।’

লেবার পার্টির উত্থান
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সমর্থন বাড়াও ফারাজের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। গত মাসে অ্যান্ডি বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে লেবার পার্টি জনমতে উত্থান দেখছে। বর্তমানে লেবার পার্টি ২৮ শতাংশ ও রিফর্ম ২৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই বার্নহাম টেলিভিশন-বেতার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছেন। যদিও আগামী জাতীয় নির্বাচন হতে এখনো তিন বছর বাকি, তবু তিনি লেবার পার্টিকে ঘিরে একটি বামঘেঁষা ব্লক দৃঢ় করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে ডানপন্থি ভোটের একটি বড় অংশ ভাগাভাগি করছে রিফর্ম, প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এবং অভিবাসনবিরোধী দল ‘রিস্টোর ব্রিটেন’। এই তিন দলের মধ্যে ডান রাজনৈতিক ভোট নিয়ে লড়াই তীব্র হয়ে উঠেছে।

বিলিয়নিয়ার ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীর উপহার
ফারাজ যে এই নির্বাচনে জিতবেন, তা আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। তবে গত মাসে সার্ভেশনের করা এক জনমত জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে তার প্রাপ্ত ভোটের হার কমেছে। ওই জরিপে বলা হয়েছিল, ফারাজ ৭৩ শতাংশ ও কাউন্ট বিনফেস ২০ শতাংশ ভোট পাবেন।

ফলাফল ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই তার আর্থিক ঘোষণা সংক্রান্ত পার্লামেন্টের তদন্ত আবারও সক্রিয় হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। নির্বাচন লড়ার জন্য পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগের পর এই তদন্ত সাময়িক স্থগিত ছিল। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে থাইল্যান্ডভিত্তিক এক বিলিয়নিয়ারের কাছ থেকে পাওয়া উপহারটি ফারাজের ঘোষণা করা উচিত ছিল কি না, সেটিই এই তদন্তের কেন্দ্রীয় বিষয়। পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, সাংসদদের নির্বাচনের এক বছর আগে পাওয়া যেকোনো অনুদান দায়িত্ব নেয়ার এক মাসের মধ্যে ঘোষণা করতে হবে। ফারাজ অর্থ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং তা ঘোষণা করেননি বলেও জানিয়েছেন। তবে তার দাবি, তিনি কোনো অন্যায় করেননি।

পার্লামেন্টের কর্তৃপক্ষ যদি ফারাজকে ঘোষণার নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে তিনি পার্লামেন্ট থেকে বরখাস্ত হতে পারেন এবং আসন ধরে রাখার জন্য নতুন করে ভোটের মুখোমুখি হতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রধান দলগুলোও সম্ভবত প্রার্থী দেবে। ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত রিক ট্রেসি আশা প্রকাশ করেছেন, এমন আরেকটি নির্বাচন হলে ভোটাররা নতুন করে ভাববেন। তিনি বলেন, ‘যদি আরেকটি নির্বাচন হয়, তবে সম্ভবত মানুষ বুঝতে পারবে যে আগুনের সঙ্গেই ধোঁয়া থাকে।’

এএম