প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়ালো যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ট্রেজারি বিভাগের কার্যালয়ের সিলমোহর; দেশটির জাতীয় ঋণ রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে
বিদেশে এখন
0

যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। দেশটির ট্রেজারি বিভাগ গত গতকাল (বুধবার, ১৯ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সুদের ক্রমবর্ধমান খরচের বিপরীতে করছাড়ের কারণে সরকারের আয় কমতে থাকায় সামনে ভয়াবহ আর্থিক সংকট অপেক্ষা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জনগণের কাছে থাকা ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং আন্তঃসরকারি ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে এটি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি ঘটেছে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্প ও তার উত্তরসূরি জো বাইডেনের নেয়া বিপুল ঋণের কারণে। বাকিটা এসেছে দুই প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক নীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজস্ব ঘাটতি থেকে।

স্বাধীন সংস্থা ‘কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেট’-এর প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ‘৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ শুধু সরকারি হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে অনুভূত হচ্ছে এবং কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, যত বেশি ঋণ নেয়া হবে, ততই মূল্যস্ফীতি বাড়বে, বাজেটের অন্যান্য অগ্রাধিকার সংকুচিত হবে এবং দেশ যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্বল হয়ে পড়বে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র পাঁচ মাসেরও কম সময়ে ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল দুই শতাব্দীরও বেশি।

মার্কিন ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মালিক বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তবে গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমেছে। কিছুদিন আগে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের নিলামে ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারিত হয়েছে। বন্ড ইস্যুর চাপ বেড়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদহার প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বুধবার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারির বাইব্যাকের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে, যা প্রতি অভিযানে কমপক্ষে ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে।

বন্ডের সুদহার বাড়লে গৃহঋণ, গাড়ি ও বাণিজ্যিক ঋণের সুদও বাড়ে। ঋণের বোঝা কমার কোনো লক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুধবারও সুদহার কমানোর জন্য তার পুরোনো দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। বন্ড বাজারের অস্থিরতা নিয়ে মার্কিনদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘মোটেও না। আমরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ এবং এই অযৌক্তিক সুদহার সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছি। দেশ যখন শক্তিশালী থাকে, তখন সুদহার কমা উচিত।’

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মহামারির প্রভাবে সরকারি ঋণ ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ঋণ বেড়েছে আরও ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার, অবকাঠামো ও সবুজ জ্বালানি খাতে বিপুল ব্যয়ের কারণে ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটির বার্ষিক অর্থনীতির আকারের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। ‘কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বহুল আলোচিত আইন ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ আরও ৪ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যোগ করবে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যার ৬০ শতাংশই ব্যয় হয় সোশ্যাল সিকিউরিটি, মেডিকেয়ার, মেডিকেইড ও সাবেক সেনাসদস্যদের সেবার মতো বাধ্যতামূলক খাতে। আরও ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। ২০২৫ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রথমবারের মতো পেন্টাগনের ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

এএম