ইরান সংকট: অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেয়া দেশগুলোকে কীভাবে প্রতিহত করবে তেহরান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি
বিদেশে এখন
0

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যেসব দেশ শামিল হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেয়া যেকোনো দেশকে ইরান শত্রু হিসেবে গণ্য করবে। এমন সময়ে এই হুঁশিয়ারি এলো, যখন আগামীকাল (সোমবার, ২৪ আগস্ট) ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার কথা রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরান কী বলেছে

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে মোহসেন রেজায়ি বলেন, ইরান বিশ্বের সব দেশের কাছে বিশেষ করে প্রতিবেশীদের কাছে আবেদন করছে যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপে যে দেশই অংশ নেবে, তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে।’ তিনি ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেন।

রেজায়ি প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, ‘ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধে তারা অংশ নিলে হরমুজ প্রণালি তো বটেই, এমনকি বিকল্প রপ্তানি পথ দিয়েও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেল বের হতে দেয়া হবে না। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে।’

এর কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান চালাবে তার মাকিন যুক্তরাষ্ট্র। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেয়া দেশকে বিপুল অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হবে।’ পরের দিনই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, না হয় আমাদের বিপক্ষে।’ এসময়ে তিনি চীনকেও সহযোগিতার আহ্বান জানান, কারণ চীন ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে।

আজ (রোববার, ২৩ আগস্ট) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বলেন, ‘ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে লিপ্ত।’ তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ ধারণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে ইরান ভেঙে পড়বে এবং ভেনেজুয়েলার মতো হয়ে যাবে। তা শুধু হয়নি, বরং ইরান তার প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্য দিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে।’

কীভাবে প্রতিশোধ নেবে ইরান

মোহসেন রেজায়ি ইরানের কৌশলকে তিন ধাপে বর্ণনা করেছেন। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা প্রথমে তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। তাদের বলব সরে দাঁড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘তারা যদি তা না করে, তাহলে আমরা আঘাত করব। ওই দেশের স্বার্থগুলোকে হামালার লক্ষ্যবস্তু বানাব।’

রেজায়ির হুঁশিয়ারিতে হরমুজ প্রণালির বাইরের বিকল্প রপ্তানি পথগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত রয়েছে। এর মধ্যে বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগরে যাওয়ার পথটি উল্লেখযোগ্য। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব এই পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করছে।

নেদারল্যান্ডসের ক্লিনগেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরান গবেষক হামিদরেজা আজিজি এক্স প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, তেহরান প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তার মতে, ইরানের নতুন আক্রমণাত্মক মতবাদে দুটি উপাদান স্পষ্ট হচ্ছে প্রথমত, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক আঘাত, যার লক্ষ্য সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তা রোধ করা; দ্বিতীয়ত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিশোধ নেয়া, যার লক্ষ্য যেকোনো হামলার খরচ এতটাই বাড়িয়ে দেয়া যাতে প্রতিপক্ষ নিরস্ত হয়।

প্রতিবেশী দেশগুলো কী করবে

উপসাগরীয় দেশগুলো একই সঙ্গে ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। ফলে তারা এই সংঘাতের মাঝখানে পড়েছে। ইরানের হামলায় তাদের অর্থনীতি ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল, কিন্তু গত সপ্তাহে মিসাইল হামলার অভিযোগ এনে তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সৌদি আরব ও ইরান ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে সম্পৃক্ততাই নিরাপদ এই হিসাব থেকেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন আল জাজিরাকে বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো মানচিত্রে নিজদের অবস্থান তো বদলাতে পারবে না। তাদের ইরানের পাশেই বসবাস ও কাজ করতে হবে। ইরানের পতন হলে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা তারাও চায় না।’

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, ‘সংকট সমাধানে কূটনীতির ওপর আস্থা কম থাকলেও অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধের সামর্থ্য রাখে না।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত এখন অনেক কম। যুদ্ধবিরতির সময়েও মজুত পুনরায় পূরণ করা সম্ভব হয়নি।’

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস

১৯৭৯ সালের ইসলামিক রেভল্যুশনের পর থেকেই ইরান বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে আসছে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে পণবন্দি ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করা হয় এবং ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ জব্দ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করেন। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তী বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পথে হাঁটে। ২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নামে পারমাণবিক চুক্তি সই করে। এই চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা ছিল।

তবে ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতির আওতায় সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। ২০১৯ সালে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরকে (আইআরজিসি) বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হন।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাইডেন প্রশাসন বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর যে যুদ্ধ শুরু হয়, তার পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ইরান তখন থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এক ডজনেরও বেশি স্থানে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম