হরমুজে কেন তৈরি হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি?
উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি হামলা যত বাড়ছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ঝুঁকি তত ঘনীভূত হচ্ছে। সামুদ্রিক তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে অন্তত৪২টি ট্যাংকার আটকা পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া ওমান উপসাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে শত শত অন্যান্য নৌযান হয় অপেক্ষায় রয়েছে, না হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করছে।
আটকা পড়া ট্যাংকারগুলোর মধ্যে অন্তত ১৮টিতে জ্বালানি তেল রয়েছে, যার সমন্বিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার বা ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এই পরিমাণ জ্বালানি তেল বিশ্ববাজারের দৈনিক চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশের সমান, যা দিয়ে অন্তত ৭১৪টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল পুরোপুরি পূর্ণ করা সম্ভব। এসব জ্বালানি তেলের ট্যাংকারে হামলা হলে বা কোনো একটি ডুবলে লাখ লাখ লিটার অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে, যা উপকূলীয় এলাকা, মৎস্যসম্পদ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ফেলবে।
সংঘাতের তীব্রতা ও বর্তমান চিত্র
গত ৮ সেপ্টেম্বর ওমান উপসাগর ও খার্গ দ্বীপের কাছে ইরানের পাঁচটি তেলের ট্যাংকার বিকল করে দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর আরও তিনটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে জ্বালানি তেহরানও অননুমোদিত রুট ব্যবহারের অভিযোগে বেশ কিছু জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অঞ্চলটিতে অন্তত ৭৫টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২১ জন নাবিক। দুটি ঘটনায় ইতোমধ্যে সমুদ্রে স্বল্পমাত্রায় জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছয়টি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ওমান উপকূলে ক্যারোলিন বেজেঙ্গি নামের একটি জাহাজে বিস্ফোরণের পর ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ার সতর্কবার্তা জারি করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সামুদ্রিক জীবন ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতের জ্বালানি তেলকূপে অগ্নিকাণ্ড ও সমুদ্রে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে শত শত কিলোমিটার উপকূলীয় পরিবেশ কয়েক দশকের জন্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ৩৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের কারণে আবারও একই ধরনের হুমকি দেখা দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরের পানিতে বিরল প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ বন, সামুদ্রিক ঘাসের বিশ্ব এবং সামুদ্রিক কচ্ছপ ও দুগংয়ের মতো বিপন্ন প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি তেল পানির ওপরে স্তরীভূত হয়ে সূর্যালোক ও অক্সিজেন প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। এতে সামুদ্রিক অণুজীব, প্রবাল এবং মাছের ডিম বা পোনা ধ্বংস হয়ে যায়।
সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুসেইন সামহ আল মাসরুরি বলেন, ‘জ্বালানি তেল ও হাইড্রোকার্বন সরাসরি মাছ, প্রবাল ও প্লাঙ্কটনের ক্ষতি করে। প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভের মতো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক বাসস্থানে এই দূষণ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে মৎস্যসম্পদ কমিয়ে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
কোটি কোটি মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহে হুমকি
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাড়ে ছয় কোটির বেশি মানুষের পানির প্রধান উৎস হল সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শোধন (ডি স্যালাইনেশন) ব্যবস্থা। এ ছাড়া ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে বসবাসকারী প্রায় দেড় কোটি মানুষও এই শোধনাগারগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
পানির উৎসের কাছে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়লে শোধনাগারে অপরিশোধিত পানি প্রবেশ ব্যাহত হয় এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। চরম পরিস্থিতিতে শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত দূষণ শনাক্ত ও জ্বালানি তেলের প্রবাহ রোধ করা না গেলে সমগ্র অঞ্চলের খাবার পানি সরবরাহে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
—আল জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে





