রেকর্ড ঋণ ও তেলের চড়া দাম; আবার কি মন্দার মুখে বিশ্ব পুঁজিবাজার?

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন

নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারের চাঙ্গাভাবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত চার্জিং বুল ভাস্কর্য
অর্থনীতি
বিদেশে এখন
0

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ওপর ভর করে গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন নতুন করে বড় ধসের সংকেত দেখা যাচ্ছে। চড়া সুদের হার, ইরান যুদ্ধ, তেলের অনিয়ন্ত্রিত দাম এবং এআই প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে তৈরি হওয়া ফাঁপা অর্থনৈতিক ভিত্তি বিশ্ব বাজারকে আবারও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক সপ্তাহে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। ফলে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও ব্যয় নীতির কারণে ওয়াশিংটনের ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বন্ড বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মূল দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া কৃত্রিম অর্থনৈতিক জোয়ার। প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ সাতটি প্রতিষ্ঠান—এনভিডিয়া, অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, আমাজন ও টেসলার যৌথ বাজারমূল্য ২০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে বিনিয়োগের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও শেয়ারের বাজারমূল্য পরিমাপক সূচক ক্যাপ রেশিও বেড়ে প্রায় ৪১ পয়েন্টে ঠেকেছে। ২০০০ সালের আলোচিত ডটকম ধসের ঠিক আগে এই সূচক ছিল ৪৪ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্যাথোম কনসাল্টিংয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই খাতের এই বিপুল মূলধনি ব্যয় উসুল করতে হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এআইসংক্রান্ত বিক্রি অতিরিক্ত ৬০০ থেকে ৮০০ বিলিয়ন ডলার বাড়াতে হবে। যা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা একেবারেই কম। ফলে আগামী বছর এআই খাতের এই অতিরিক্ত স্ফীতি উবে গিয়ে বাজার ধসের শঙ্কা অন্তত ৩০ শতাংশ। এই অনিশ্চয়তার কারণে ডাটা সেন্টার তৈরিতে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া ওরাকলের মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। এমনকি ঋণে শেয়ার কেনা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ইতিমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যা ১৯২৯ সালের মহামন্দার আগের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মূল্যস্ফীতি রুখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও সুদের হার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। সুদের হার বাড়িয়ে ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ করেছে ব্যাংক অব জাপান। সুদের হার বাড়িয়েছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। আর ব্যাংক অব ইংল্যান্ড আগামী বছরের মধ্যে সুদের হার একাধিকবার বাড়াতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে। চড়া সুদের হারের কারণে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা পরিচালনা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে পুরো অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হালডেন জানান, ২০০০ সালের মতো এক মুহূর্তে হয়তো পুরো বাজার তাসের ঘরের মতো ধসে পড়বে না, তবে এআই খাতের অবাস্তব মূল্যায়নের হাওয়া বের হয়ে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির গতি মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি স্পষ্ট।

এএম