দোনেৎস্কে রাশিয়াকে পেছনে ফেরাতে ইউক্রেনের পাল্টা অভিযান, বাড়ছে বেসামরিক হতাহত

রুশ বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক কারখানার ভবনে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন
বিদেশে এখন
0

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কে রুশ বাহিনী একাধিক বসতি থেকে পিছু হটছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিনপন্থী সামরিক বিষয়ক টেলিগ্রাম চ্যানেল রাইবার। ইউক্রেনের পাল্টা অভিযান অপারেশন ভিভালদির অংশ হিসেবে এ বছর লাইমানের আশপাশে ১৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করা হয়েছে। এদিকে রুশ হামলায় ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং যুদ্ধে রুশ সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

লাইমান এলাকায় কী ঘটছে?
লাইমান দখল করতে চায় রাশিয়া। শহরটি দখল করতে পারলে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক শহর নিয়ে গঠিত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বলয়ের দিকে বড় অভিযান চালানোর সুযোগ পাবে মস্কো। রাইবার ৭ অক্টোবর জানায়, লাইমানের দক্ষিণে কয়েকটি গ্রাম থেকে রুশ বাহিনী পিছু হটছে।

রাইবারের ভাষ্য, রুশ সেনারা পৌঁছানোর আগেই কিছু গ্রাম দখলমুক্ত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়ায় ইউক্রেনীয় বাহিনী সেখানে শক্তি জড়ো করে পাল্টা আক্রমণ চালানোর সুযোগ পেয়েছে। স্লোভিয়ানস্কের পূর্বে সিভেরস্কি দোনেৎস নদীর রুশ-নিয়ন্ত্রিত ডান তীরের উঁচু ভূমিতে অবস্থিত ক্রিভা লুকা গ্রাম ঘিরে নতুন লড়াইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এলাকাটি দখলে রাখতে পারলে আরও পূর্বে পাল্টা আক্রমণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রয়টার্সকে বলেছেন, অপারেশন ভিভালদি সফল হলেও এখনো অসম্পূর্ণ। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রুশ বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার অভিযানে সেপ্টেম্বরে আগের চেয়ে বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাব নিয়ে মতভেদ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, সেপ্টেম্বরে রাশিয়া ইউক্রেনের ১ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে। তবে ভূ-অবস্থান নির্ণয় করা উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের হিসাবে, ওই মাসে রাশিয়া বরং ৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা হারিয়েছে।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, সেপ্টেম্বরে রুশ বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ২৩০, যা ২০২৬ সালের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৮৭ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের মানববিহীন আকাশযান বাহিনীর প্রধান রবার্ট ব্রোভদির ভাষ্য, অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনে রুশ হতাহতের সংখ্যা আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত পুরো যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত ও আহত সেনার সংখ্যা ১৫ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫০ বলে দাবি করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী।

বেসামরিক হতাহত বাড়ছে কেন?
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে। ৭ অক্টোবর উত্তরের চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে পাঁচতলা আবাসিক ভবনে রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাঁচ শিশুসহ ২২ জন নিহত হন। সেদিন ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, রাশিয়া ১২টি অঞ্চলে ১৩০টি ড্রোন, ৪৮টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিয়েভ ও ওলেকসান্দ্রিয়ায় আরও অন্তত দুজন করে নিহত হন।

এর পরদিন ক্রামাতোরস্ক শহরে যাত্রীবাহী দুটি বাসে রুশ বোমা হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হন। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের দাবি, রাশিয়ার গেরান-৪ ও গেরান-৫ জেটচালিত ড্রোনে উপগ্রহ, উন্নত দিকনির্ণয় ব্যবস্থা ও স্থাপনা শনাক্ত করার ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এসব প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তাই বেসামরিক স্থাপনায় হামলা দুর্ঘটনাবশত হওয়ার আশঙ্কা কম বলে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়া অক্টোবরের প্রথম চার দিনে দিনিপ্রো নদীর ওপর কিয়েভের উত্তর ও দক্ষিণের সেতুতে সাতবার হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইউক্রেনের মন্ত্রিসভার বৈঠক হওয়া একটি ভবন এবং রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর হিসাবে, ৭ অক্টোবরের হামলায় তারা জেটচালিত ড্রোনের ৮০ শতাংশ, প্রপেলারচালিত ড্রোনের ৯৫ শতাংশ এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ৮০ শতাংশ ভূপাতিত করেছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা হামলা
রাশিয়ার ড্রোন হামলা ঠেকাতে মিত্রদের কাছ থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করার চেষ্টা করছে ইউক্রেন। জেলেনস্কির দাবি, এসব যুদ্ধবিমান ড্রোন হামলার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধ্বংস করছে। ইউক্রেন পাঁচ ধরনের প্রতিরোধী ড্রোন পরীক্ষা করছে; এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরটির সাফল্যের হার ৩০ শতাংশ। ছোট আকারের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও পরীক্ষা চলছে। কিয়েভে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভারী মেশিনগানের ১২টি টারেট বসানো হয়েছে; দেশের অন্যান্য এলাকায় আরও বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা গুদাম, কারখানা, সেতু বা বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের মতো নির্দিষ্ট স্থাপনা রক্ষায় কাজে লাগতে পারে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ৭ অক্টোবর কিয়েভ সফরে গিয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরোর সামরিক সহায়তা ঘোষণা করেন। ইউক্রেনের সঙ্গে ড্রোন প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য অস্ত্র যৌথভাবে তৈরি করতে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তিও সই হয়।

ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ২ অক্টোবর ভলগোগ্রাদ এবং ৮ অক্টোবর বাশকোর্তোস্তানের তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর কথা জানায় কিয়েভ। রাশিয়ার তেল পরিশোধন সক্ষমতার ৫১ শতাংশের বেশি অকার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী।

সামারা অঞ্চলের তেল উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ। তাদের দাবি, সেখানে ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ১১টি এবং ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ৩টি তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। ওই কেন্দ্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রের তেল মিশিয়ে রাশিয়ার রপ্তানিযোগ্য ইউরালস মানের তেল তৈরি করা হয় বলে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। তাদের হিসাবে, রাশিয়ার মোট তেল রপ্তানির অর্ধেক পর্যন্ত এই মানের তেল হতে পারে।

এ ছাড়া ৭ অক্টোবর আস্ত্রাখান গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে এবং ৪ অক্টোবর আদিগেয়া বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইউক্রেন। আদিগেয়ায় একটি সু-৩৫ যুদ্ধবিমান ও একটি সু-৩৪ যুদ্ধবিমান ধ্বংস এবং ব্রায়ানস্কের সেশচা বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। দখলকৃত এলাকায় রাশিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত করতে ৬ জুলাই থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৪৫৬টি মাঝারি পাল্লার হামলা চালানো হয়েছে বলেও তাদের দাবি।

এএম