যে বয়সে রাজনীতি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন অনেক প্রবীণ নেতা। সে বয়সে ব্রাজিলের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়লেন ব্রাজিলের ৮১ বছর বয়সী বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
১৯৮৯ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফেরার পর এ এক বিরল ঘটনা। প্রথম রাউন্ডের ভোটে পিছিয়ে থেকেও রান-অফ বা দ্বিতীয় দফার ভোটে ১০ মিলিয়নেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হলেন সিলভা। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ভোট।
একজন সাধারণ শ্রমিক-ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে। কারাবাস, ক্যান্সার জয় করে ব্রাজিলের মূল ধারার রাজনীতিতে টিকে থাকা। এর আগে যখন দুর্নীতিবিরোধী মামলায় কারাবন্দি হন তখন অনেকেই ধারণা করেছিলো লুলার রাজনৈতিক জীবন সম্ভবত শেষ।
কিছু জনকল্যাণমুখী নীতি লুলাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার ‘বোলসা ফামিলিয়া’-সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি কল্যাণমূলক ভাতা বাড়ানো এবং শ্রমিকবান্ধব প্রতিশ্রুতি ভোটারদের আকৃষ্ট করে।
আরও পড়ুন:
দেশে দেশে ডানপন্থিদের উত্থান। গত ১৮ মাসে লাতিন আমেরিকার কয়েক দেশে টানা সাতটি নির্বাচনে ডানপন্থি প্রার্থীরা জয়ী হন। আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়াসহ বেশ কিছু দেশ রক্ষণশীলদের নিয়ন্ত্রণে। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ও সবচেয়ে জনবহুল দেশ ব্রাজিলে লুলার এ পুনর্নির্বাচন ডানপন্থার সেই জয়রথ থামিয়ে দিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক এ অঞ্চলজুড়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ বা ‘অরেঞ্জ ওয়েভ’-এর উদ্বেগের কথা বলেন। তাদের মতে, কিছু লাতিন দেশ এখন ট্রাম্পের সঙ্গে পুরোপুরি জোটবদ্ধ। বাকিদের অনুগত করতে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। এরকম প্রেক্ষাপটে লুলার জয় একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য। কট্টর ডানপন্থি, ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করেছেন, লাতিন আমেরিকা ওয়াশিংটনের একমুখী প্রভাবের বাইরে যেতে সক্ষম।
এরই মধ্যে লুলার এ বিজয়কে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে বহু দেশের নেতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা। ভারত, চীন, রাশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, কিউবাসহ অনেক দেশের নেতা তার পুনর্নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘আমরা লুলার বিজয়কে স্বাগত জানাই। তিনি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নেই নয়, বরং ব্রিকস ও অন্যান্য সংস্থার চলমান প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতাতেও ব্যাপক অবদান রাখেন। আশা করি, ভবিষ্যতেও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘চীন লক্ষ্য করেছে, ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনি আদালত দেশটির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। চীন তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। চীন-ব্রাজিল অভিন্ন ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনে অবিচলিতভাবে কাজ করবে। চীন ব্রাজিলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’
নির্বাচনি প্রচারে লুলার ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, নিজের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মনোভাব শিথিল না করেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাবেন তিনি। আবার সিলভার এ জয়কে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার বামপন্থী অভিভাবক হয়ে ওঠা হিসেবে দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।





