ইউরোপের সুপারমার্কেটের ফ্রিজ হ্যাক করছে কারা, নেপথ্যে কী?

সাইবার হামলায় ফ্রিজ অচল হওয়ায় নষ্ট হওয়া খাবার সরিয়ে দিচ্ছেন দোকানের কর্মী।
বিদেশে এখন
0

ইউরোপের সাতটি দেশের সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজার হঠাৎ অকেজো হয়ে পড়েছে। হ্যাকাররা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো কোনো ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘এটি আমাদের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো এবং এর ওপর ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।’ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় এমন সাইবার হামলার পর এর সম্ভাব্য হোতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

কোন কোন সুপারমার্কেট আক্রান্ত হয়েছে এবং এর অর্থ কী?

বেলজিয়ামে ক্যারফুর, ইন্টারমার্শে ও আইকিয়ার শাখা, সুইডেনে কুপ ও আইসিএ, লুক্সেমবার্গে দেলহাইজ, ফিনল্যান্ডে কেসকো, আয়ারল্যান্ডে সুপারভ্যালু এবং এস্তোনিয়ার বিভিন্ন দোকানের ফ্রিজে এ হামলা হয়েছে।

তিন সপ্তাহ আগে ফ্রান্সেও একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তখন ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যারের দখল নেয় অজ্ঞাত হ্যাকাররা। এতে ফ্রিজগুলো হঠাৎ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় ফরাসি খুচরা বিক্রেতাদের বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দিতে হয়।

গত আগস্টের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রেও এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সে সময় দেশটির অন্তত ছয়টি সামরিক ঘাঁটির বিপণিবিতানে রহস্যজনকভাবে ফ্রিজ নষ্ট হয়ে যায়। পেন্টাগন ওই ঘটনায় সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের বিষয়ে তদন্ত করছে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে সাইবার হামলা ও হ্যাকিংয়ের কৌশলে নতুন এক দিক সামনে এল। কেবল ফ্রিজের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই যে হ্যাকারদের নাগালে রয়েছে তা নয়। দূর থেকে পরিচালনা ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে অনেক ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, ডিশওয়াশার এবং কেন্দ্রীয় হিটিং ব্যবস্থাও ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

কারা এ হামলা চালাচ্ছে?

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো হ্যাকার গোষ্ঠী এখনো এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। আবার কোনো র‍্যানসমওয়্যার চক্রও এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সুপারমার্কেটগুলোর কাছে মুক্তিপণ দাবি করেনি। অবশ্য মুক্তিপণ দাবি করা কঠিনও, কারণ ফ্রিজ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খাবারের ক্ষতি হয়ে যায়।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক রাফে পিলিং বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে সম্ভাব্য দুটি কারণ মনে হচ্ছে। হয় কোনো রাষ্ট্র নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে ও বার্তা দিতে এটি করছে, অথবা কোনো একক হ্যাকার ব্যক্তিগত কারণে এসব হামলা চালাচ্ছে।’

তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হামলার ধারণাটিই সবচেয়ে জোরালো। কারণ, দোকানের তাক থেকে খাবার সরিয়ে ফেলার দৃশ্য বিপুলসংখ্যক মানুষের মনের ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। গত সপ্তাহে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে অর্থ চুরির ঘটনার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ফ্রিজ হ্যাকিংয়ের এই ঘটনায় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা সন্দেহের তালিকায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।

পশ্চিমা গোয়েন্দা প্রধানেরা বলছেন, মস্কো ইউরোপে নানা উপায়ে নাশকতামূলক তৎপরতা চালাচ্ছে এবং আগামী মাসগুলোতে তা আরও তীব্র হতে পারে।

হ্যাকিংয়ের এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ায় অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কাজে কোনো ম্যালওয়্যারের প্রয়োজন হয়নি। অর্থাৎ ঘটনাস্থলে অস্ত্রের কোনো চিহ্নই নেই। পিলিং বিষয়টিকে ‘হাতে রাবারের গ্লাভস পরে সুইচ ওলটপালট করে দেয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে?

বাণিজ্যিক ফ্রিজ পরিচালনাকারী সফটওয়্যারগুলো ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে কোডিংয়ে কোনো দুর্বলতা থাকলে হ্যাকাররা তার সুযোগ নিতে পারে। ডেস্কটপ কম্পিউটার বা মুঠোফোনের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ত্রুটি সারাতে নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ বা প্যাচ ইনস্টল করার সতর্কবার্তা পান ব্যবহারকারী ও আইটি ব্যবস্থাপকেরা। কিন্তু ফ্রিজের মতো যন্ত্রের সফটওয়্যারগুলো দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ ছাড়াই পড়ে থাকে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডারের সাইবার অপারেশনস পরিচালক নিক জ্যাকসন বলেন, সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে সময় লাগে এবং ওই সময়টায় যন্ত্রপাতি অফলাইনে বা বন্ধ রাখতে হয়। খাদ্যপণ্য বিক্রেতাদের জন্য এটি বড় সমস্যা হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এ কাজে ধীরগতি দেখায়। তবে এর চেয়েও সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে যে ফ্রিজ পরিচালনাকারীরা সমস্যাটি সম্পর্কে জানেনই না। জ্যাকসনের ভাষায়, ‘তারা এ নিয়ে ভাবেন না এবং এটি তাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষেও থাকে না।’

সোমবারের হামলার ঘটনায় সুইডেনের কুপ জানিয়েছে, তাদের কিছু ফ্রিজ ফোর-জি মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে ছিল। অন্যদিকে আইসিএ জানিয়েছে, তাদের সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ড্যানফস। ফ্রান্সেও এই প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমেই সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

নিজেদের সুরক্ষায় দোকানগুলো কী করতে পারে?

সহজ উত্তর হলো সফটওয়্যার সিস্টেম হালনাগাদ করা। বেলজিয়ামের রেফ্রিজারেটর গ্রুপ সাবকোবেল জানিয়েছে, গত ১২ অক্টোবর ফ্রান্সে হামলার পর তারা ফ্রিজগুলোর সফটওয়্যার হালনাগাদ শুরু না করলে সোমবারের হ্যাকিংয়ে ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারত।

যুক্তরাজ্যে এখনো এ ধরনের হামলা হয়নি। তবে ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের নিয়ন্ত্রকবিষয়ক সহকারী পরিচালক গ্রাহাম উইন বলেন, খুচরা বিক্রেতারা ‘সম্ভাব্য হামলা থেকে নিজেদের ফ্রিজ ও ফ্রিজারগুলো যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখতে বর্তমানে ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের (এনসিএসসি) সঙ্গে কাজ করছেন’।

ব্রিটিশ সুপারমার্কেটগুলোতে এখনো কেন হামলা হয়নি?

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফোরস্কাউটের তথ্যমতে, ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট দানিয়েল দস সান্তোস বলেন, ‘অনলাইনে উন্মুক্ত থাকা সুপারমার্কেটের এসব সিস্টেমের তথ্য যাচাই করে আমরা দেখেছি, শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় যুক্তরাজ্য নেই।’ তিনি জানান, ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেয়া না গেলেও ‘বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জন্য এই মুহূর্তে ঝুঁকি খুব বেশি বলে আমি মনে করি না’।

এনসিএসসির একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘ঘটনার বিস্তারিত পুরোপুরি বুঝতে আন্তর্জাতিক অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট খাতের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।’

এএম