সাংবাদিকদের ধারণা, দীর্ঘকাল তারা মানুষের সামনে থাকেন ফলে তাদের একটা পরিচিতি তৈরি হয়। যা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দেয়। অনেক সাংবাদিক দীর্ঘকাল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে করতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং পরে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন। ফলে সাংবাদিক জগৎ থেকে এসে দলের প্রার্থী হিসেবে কাজ করা বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এখন সাধারণ বিষয় হিসেবেই মনে করা হয়।
যদিও একজন সাংবাদিক যখন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন তখন তার আগের কাজের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আবার এমনও অভিযোগ ওঠে কিছু সাংবাদিক বা গণমাধ্যম সরাসরি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজেই সরাসরি এই অভিযোগ তুলে থাকেন যা ‘গোদি মিডিয়া’ নামে পরিচিত।
সেই মমতাকেই দেখা গেছে প্রচারণা ও জনসংযোগের জন্য গণমাধ্যমের পরিচিত মুখদের বেছে নিতে। আবার মমতার দেখাদেখি বিরোধীদলগুলোও পরিচিত সাংবাদিকদের নিজেদের দলে টানছে। এমনকি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে প্রার্থীও করেছে এই রাজনৈতিক দলগুলো।
আরও পড়ুন:
২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজ্যটির ২৯৪টি আসনের মধ্যে মোট চার সাংবাদিককে নির্বাচনি ময়দানে দেখা যাবে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে দু’জন লড়াই করছেন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধীদল বিজেপির প্রার্থী তালিকাতেও জায়গা পেয়েছে দুই সাংবাদিক।
এদের মধ্যে অন্যতম কুণাল ঘোষ। তৃণমূলের টিকিটে বেলেঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রে থেকে লড়াই করবেন তিনি। রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ কুণাল বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মুখপাত্র। সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে বছর কয়েক আগে সিবিআই এর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল তাকে।
কারাগারে যাওয়ার পথে কুণাল তখন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলে বলেছিলেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন সারদার রুপি কোথায় আছে? ফলে মমতা ও তৃণমূলের সঙ্গে কুণালের একসময়ের ঘনিষ্ঠতা তিক্ততা ও দূরত্বে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কালের চক্রে এবার তিনিই তৃণমূলের প্রার্থী। আর এর মধ্যে দিয়ে কুণাল বাস্তব জীবনে প্রমাণ করে দেখালেন ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়!’
প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই নাওয়া খাওয়া ভুলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, জনসংযোগের মাধ্যমে নিজেকে তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন কুণাল।
আরও পড়ুন:
খড়দহ কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে লড়ছেন দেবদীপ পুরোহিত। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার সাবেক সাংবাদিক দেবদীপ রাজনীতি ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিটে যথেষ্ট পারদর্শীতার সঙ্গে কাজ করেছেন। ওপার বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশেও তার যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে তার। শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ফোনও এসেছে তার কাছে।
সিউড়ি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী সাবেক সাংবাদিক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট হিসেবে ২০১২ থেকে ২০২১ পর্যন্ত কাজ করেছেন। তার আগে বর্তমান পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স করেসপন্ডেন্ট ছিলেন। পরবর্তীতে বিজেপিতে যোগ এবং রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব সামলেছেন।
দু’দিন আগেও কলকাতার পরিচিত এবং তরুণ সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সন্তু পান। নির্বাচনের আগেই সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বিজেপির টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন সন্তু। রিপাবলিক টিভির এই পরিচিত সাংবাদিককে তারকেশ্বর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছে।
কিন্তু সাংবাদিকরা তাদের নিজেদের পেশা ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রার্থী হচ্ছেন? তবে কি ক্ষমতার লোভ?
আরও পড়ুন:
এই প্রশ্নের উত্তরে দেবদীপ পুরোহিত বলেন, ‘ঠিক তেমনটা নয়! রাজনীতিতে আসা শুধু সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, অভিনেতা বা ক্রীড়াবিদ—সমাজের নানা স্তরের মানুষই রাজনীতিতে আসেন। এতে রাজনীতি আরও সমৃদ্ধ হয়।’
কিন্তু সাংবাদিক যখন তার পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেয় তখন তার আগের কাজের নিরপেক্ষতা নিয়ে কি প্রশ্ন ওঠে না? সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন দেবদীপ।
তিনি বলেন, ‘সমাজের ভীত নড়বড়ে হলে নিরপেক্ষ থাকা সবসময় সম্ভব নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমও অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। এই সময়ে সঠিক অবস্থান নেয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের জয় সম্পর্কে আশাবাদী দেবদ্বীপ পরম ভবিষ্যতে সাংবাদিকতার পেশায় ফিরে আসবেন কি না তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এমুহূর্তে আমার লক্ষ্য শুধু নির্বাচন। ছোট ছোট লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি, ভবিষ্যৎ পরে ভাবা যাবে।’
আরও পড়ুন:
তবে এবারই নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক দলে প্রবেশ দেখা গেছে। একটা সময় সাংবাদিকতার পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর বিজেপিতে যোগ দেন শমীক ভট্টাচার্য। বর্তমানে দলটির রাজ্য সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
সর্বভারতীয় গণমাধ্যমে (দিল্লী) এক পরিচিত নাম সাগরিকা ঘোষ। সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে ২০২৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন সাগরিকা। বর্তমানে তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য।
তারও আগে, রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হয়ে জয় পাওয়া, এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার উদাহরণও আছে। মাতৃভূমি পত্রিকার দিল্লি সংবাদদাতা কে পি উন্নিকৃষ্ণন- ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন এবং পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মতো সর্বভারতীয় দৈনিকে এডিটর হিসেবে কাজ করা অরুণ শৌরি বিজেপির টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য এশিয়ান এজ- এর মত সর্বভারতীয় দৈনিকে সুনামের সঙ্গে কাজ করা সাংবাদিক এম জে আকবর। বিজেপিতে যোগদান করে ২০১৬ সালে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন আকবর।
সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে দিল্লির অত্যন্ত পরিচিত রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন মণীশ সিসোদিয়া। পরবর্তীতে দিল্লির সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ও কাজ করেছেন। তথ্যচিত্র নির্মাণের পাশাপাশি টেলিভিশনের নিউজ রিডার হিসেবে কাজ করেছিলেন সিসোদিয়া।
এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত অটলবিহারী বাজপেয়ীরও পেশা ছিল সাংবাদিকতা। রাজনীতিতে যোগ দেয়া কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে রাষ্ট্রধর্ম, পাঞ্চজন্য, বীর অর্জুন- এর মতো দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছিলেন।৭





