কে হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (বামে), অ্যাঞ্জেলা রায়নার (মাঝে), ওয়েস স্ট্রিটিং (ডানে)
ইউরোপ
বিদেশে এখন
0

টানাপোড়েন আর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। তবে আকস্মিক এই বিদায়ের পরই প্রশ্ন উঠেছে, কে হচ্ছেন ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী বাসিন্দা?

আজ (সোমবার, ২২ জুন) এক ঘোষণায় কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে নতুন সরকারপ্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে তিনি নিজের দল লেবার পার্টিকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

এদিকে, সোমবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রীদের একটি তালিকা ও সমীকরণ তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনায় থাকা শীর্ষ হেভিওয়েট প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল নিচে তুলে ধরা হলো।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম: দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে ‘কিং অব দ্য নর্থ’

নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। জনমত জরিপ অনুযায়ী, লেবার পার্টির এমপি ও সাধারণ ভোটার; উভয় পক্ষের কাছেই তিনি বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ।

রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও অভিজ্ঞতা: প্রায় এক দশক ধরে ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টারের’ মেয়র হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করায় দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঝুলি রয়েছে তার। এই কারণেই রাজনীতিতে তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বা উত্তরের রাজা হিসেবে পরিচিত। ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি লি আসনের এমপি ছিলেন এবং ওই সময়ে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন।

বর্তমান অবস্থান: সবশেষ গত শুক্রবার (১৯ জুন) একটি সংসদীয় আসনের উপ-নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে পার্লামেন্টে তার দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছে, যা লেবার পার্টিতে তার অবস্থানকে আরও পোক্ত করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে হলে তাকে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থন জোগাড় করতে হবে।

অতীতের লড়াই: এর আগেও তিনি দুইবার লেবার পার্টির দলীয় প্রধান হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিলেন; তবে ২০১০ সালে এড মিলিব্যান্ড এবং ২০১৫ সালে জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন।

ওয়েস স্ট্রিটিং: বিচক্ষণ ও বাকপটু নেতা

২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন ওয়েস স্ট্রিটিং। তবে গত মে মাসে তিনি সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে টানা তিন বছর বিরোধীদলে থাকাকালীন তিনি ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন।

সাফল্য ও ভাবমূর্তি: ২০১৫ সালে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হওয়া স্ট্রিটিং সাবেক ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের প্রেসিডেন্ট এবং লন্ডনের কাউন্সিলর ছিলেন। ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাকে অত্যন্ত বাকপটু ও বিচক্ষণ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের’ চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের দীর্ঘ তালিকা কমিয়ে আনাকে তার অন্যতম বড় সাফল্য ধরা হয়।

সমীকরণ: দলের মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি এমপিদের মধ্যে তার ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে দলের ভেতরে তার কিছুটা ‘ডানপন্থি’ ভাবমূর্তির কারণে লেবার পার্টির সাধারণ তৃণমূল সদস্যদের কাছে জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অ্যাঞ্জেলা রায়নার: অবিশ্বাস্য উত্থানের এক নেত্রী

যুক্তরাজ্যের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রায়নারকে ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবিদ মনে করা হয়। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা রায়নার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

উত্থান ও বিতর্ক: একজন সাধারণ কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সময় ‘ইউনিসন’ ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন; যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দেয়। ২০১৫ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের একটি আসন থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হয়ে জেরেমি করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় আবাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং গৃহনির্মাণ বৃদ্ধি ও ভাড়াটেদের অধিকার সংস্কারে বড় ভূমিকা রাখেন। তবে ২০২৫ সালে একটি বাড়ি কেনার সময় যথাযথ ট্যাক্স (কর) পরিশোধ না করার নাটকীয় অভিযোগ উঠলে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

অন্যান্য যারা আছেন আলোচনায়

এই তিন হেভিওয়েট নেতা ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম বাতাসে ভাসছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড, যদিও তিনি নিজে এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমার জন্য সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে’।

আলোচনায় আছেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও। তবে অভিবাসন নীতি নিয়ে তার নেয়া কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ দলীয় সদস্যদের সমর্থন পাওয়া নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। এছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কৌতূহল জাগিয়েছেন সাবেক রয়্যাল মেরিন কর্মকর্তা ও বর্তমান প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী আল কার্নস।

সূত্র: বিবিসি

যুক্তরাজ্যের পরবর্তী সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড়

একনজরে ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী বাসিন্দা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শীর্ষ প্রার্থী ও তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ

প্রার্থীর নাম রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতা প্রধান সাফল্য / বর্তমান অবস্থান প্রধান রাজনৈতিক সমীকরণ ও চ্যালেঞ্জ
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম 'গ্রেটার ম্যানচেস্টারের' সাবেক সফল মেয়র এবং লি আসনের সাবেক এমপি। পূর্বে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। 'কিং অব দ্য নর্থ' নামে পরিচিত। ১৯ জুনের উপ-নির্বাচনে জিতে পুনরায় পার্লামেন্টে ফিরেছেন। জরিপ অনুযায়ী লেবার পার্টির এমপি ও সাধারণ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দৌড়ে শীর্ষে। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে কমপক্ষে ৮১ জন এমপির সমর্থন লাগবে।
ওয়েস স্ট্রিটিং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ২০১৫ সালে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন। সাবেক এনইউএস প্রেসিডেন্ট। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর চিকিৎসাপ্রার্থী রোগীদের দীর্ঘ তালিকা সফলভাবে কমিয়ে এনেছেন। অত্যন্ত বাকপটু ও বিচক্ষণ নেতা। দলের মধ্যপন্থি ও ডানপন্থিদের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও 'ডানপন্থি' ভাবমূর্তির কারণে তৃণমূল সাধারণ সদস্যদের কাছে জনপ্রিয়তা কমতে পারে।
অ্যাঞ্জেলা রায়নার যুক্তরাজ্যের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক আবাসন মন্ত্রী। ব্রিটেনের অন্যতম প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবিদ। ট্রেড ইউনিয়ন (ইউনিসন) থেকে উঠে আসা নেত্রী। গৃহনির্মাণ বৃদ্ধি ও ভাড়াটেদের অধিকার সংস্কারে বড় ভূমিকা রেখেছেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক উত্থান। তবে ২০২৫ সালে বাড়ি কেনার সময় ট্যাক্স ফাঁকির নাটকীয় অভিযোগে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল।
শাবানা মাহমুদ যুক্তরাজ্যের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় স্থান পেয়েছেন। অভিবাসন নীতি নিয়ে নেওয়া কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ দলীয় সদস্যদের সমর্থন পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আল কার্নস সাবেক রয়্যাল মেরিন কর্মকর্তা এবং বর্তমান প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। নতুন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল জাগিয়েছেন। অন্যান্য শীর্ষ হেভিওয়েটদের পাশাপাশি বিকল্প বা নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় আছেন।


*উল্লেখ্য, সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের নাম আলোচনায় থাকলেও তিনি নিজে এই পদের দৌড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

এনএইচ