পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩
এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবীণ বয়সে বাবা-মায়ের জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ভরণপোষণের সংজ্ঞা: আইনে ‘ভরণপোষণ’ বলতে কেবল খাবার দেয়াকে বোঝানো হয়নি। সন্তানের সাধ্যানুযায়ী মা-বাবার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গী বা পরিচর্যাকারী এবং বিনোদনের সুবিধা নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে।
একত্রে বসবাস ও নিয়মিত যোগাযোগ: সন্তানকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে একই মেয়াদে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে একসঙ্গে থাকা সম্ভব না হলে, মা-বায়ের ইচ্ছানুযায়ী পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিতে হবে ও সাক্ষাৎ করতে হবে।
মাতা-পিতার অনুমতি ছাড়া আলাদা করা যাবে না: পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম, আবাসন বা অন্য কোথাও একা বা আলাদাভাবে সপরিবারে বসবাসের জন্য বাধ্য করা যাবে না।
আরও পড়ুন
দাদা-দাদি এবং নানা-নানির ভরণপোষণ: পিতা-মাতা বেঁচে না থাকলে বা ভরণপোষণ দিতে অসমর্থ হলে, সন্তানকে তার দাদা-দাদি এবং নানা-নানিরও ভরণপোষণ দিতে হবে।
২০২৩ সালের বিধিমালা: যেভাবে বাস্তবায়িত হবে আইন
২০১৩ সালে আইনটি পাশ হলেও সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি বা বিধিমালার অভাবে দীর্ঘদিন এর প্রয়োগ ঝুলে ছিল। ২০২৩ সালে বিধিমালা প্রণয়নের পর এই আইনের প্রয়োগ এখন অনেক সহজ ও সুনির্দিষ্ট হয়েছে।
আর্থিক সহায়তার হার নির্ধারণ: বিধিমালা অনুযায়ী, সন্তান যদি চাকরিজীবী বা উপার্জনক্ষম হন, তবে তার আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যা সাধারণত মা-বায়ের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে) প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে বাবা-মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাঠাতে হবে।
তদারকি কমিটি গঠন: আইনটি মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য জাতীয়, জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো বাবা-মা অবহেলার শিকার হলে এই কমিটির কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
অভিযোগ সেল ও পুনর্বাসন: প্রতিটি উপজেলায় সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয় এই আইনের অধীনে অভিযোগ সেল হিসেবে কাজ করবে। অসহায় প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজনে তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে স্থানীয় প্রশাসন।
আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধান
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি একটি আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপসযোগ্য অপরাধ। কোনো সন্তান যদি এই আইনের ধারাগুলো লঙ্ঘন করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রধান শাস্তি: কোনো সন্তান যদি তার পিতা-মাতাকে ভরণপোষণ না দেন বা অবহেলা করেন, তবে তিনি অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অর্থদণ্ড অনাদায়ে তিনি অনূর্ধ্ব ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
সহযোগীদের শাস্তি: সন্তানের স্ত্রী, স্বামী কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দেয়ায় বাধা সৃষ্টি করেন বা সন্তানকে প্ররোচিত করেন, তবে তিনিও একই অপরাধে অপরাধী হবেন এবং সমপরিমাণ শাস্তির মুখোমুখি হবেন।
কোনো বাবা-মা যদি সন্তানের অবহেলার শিকার হন, তবে তিনি সরাসরি প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। তবে আদালত মামলাটি সরাসরি বিচারের জন্য নেয়ার আগে আপস-মীমাংসার জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা কোনো প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে পারেন। সেখানে সমাধান না হলে আদালত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন।





