একজন এমপি কতটা ‘ক্ষমতাধর’, তিনি কী কী কাজ করেন?

জাতীয় সংসদ ভবন
দেশে এখন
0

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (13th National Election) ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৪টি এবং জামায়াত ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। এখন চলছে বিজয়ীদের শপথ গ্রহণের (Oath-taking) প্রস্তুতি। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন—একজন সংসদ সদস্য বা এমপি (Member of Parliament) কতটা ক্ষমতাধর এবং বাস্তবে তার কাজগুলো কী কী?

মূল কাজ: আইন প্রণয়ন (Legislation)

সংবিধান অনুযায়ী (According to the Constitution), একজন এমপির প্রধান কাজ হলো জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা। দেশের প্রয়োজনীয় নতুন আইন তৈরি, বিদ্যমান আইন সংশোধন এবং জাতীয় বাজেটের (National Budget) ওপর আলোচনায় অংশ নেওয়া তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আরও পড়ুন:

স্থানীয় পর্যায়ে একচ্ছত্র প্রভাব

কাগজে-কলমে আইন প্রণেতা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন এমপি তার নির্বাচনি এলাকায় (Constituency) সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ৪০ ধরনের উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প (Social Safety Net Projects) থাকে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • কাজের বিনিময়ে খাদ্য (TR/KABIKHA)
  • বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা (Old Age & Widow Allowance)
  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন:
  • -এই প্রকল্পগুলোর সুবিধাভোগী নির্বাচনে সংসদ সদস্যের অলিখিত সম্মতি বা ডিও লেটার (DO Letter) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিয়োগে আধিপত্য

এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Educational Institutions) এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর পরিচালনা কমিটিতে সংসদ সদস্যদের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগের (Recruitment Process) ক্ষেত্রেও এমপিদের ব্যাপক প্রভাব বা একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। যদিও বিভিন্ন সময়ে এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির (Corruption) অভিযোগও ওঠে।

প্রশাসন ও পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ

সংবিধান ও আইনের বাইরেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থানীয় প্রশাসন (Local Administration) এবং পুলিশের ওপর এমপিদের এক ধরনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা থেকে শুরু করে উন্নয়নমূলক কাজের তদারকি—সবখানেই এমপির ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে বলে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় খবর প্রকাশিত হয়।

আরও পড়ুন:

সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বিশেষ অধিকার (Privileges)

সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা সংসদীয় কার্যধারার জন্য বিশেষ সুরক্ষা পান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • ১. সংসদের কার্যধারার বৈধতা নিয়ে কোনো আদালতে (Court) প্রশ্ন তোলা যাবে না।
  • ২. সংসদে দেওয়া বক্তব্য বা ভোটদানের জন্য কোনো এমপির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
  • ৩. সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকবেন।

এই সাংবিধানিক সুরক্ষা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিশাল ক্ষমতা একজন সংসদ সদস্যকে নির্বাচনি এলাকায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন – ২০২৬ লাইভ আপডেট দেখতে ,ক্লিক করুন।

আরও পড়ুন:

ক্ষেত্র / বিষয় সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব বাস্তব ক্ষমতা ও প্রভাব (মাঠপর্যায়ের চিত্র)
মূল ভূমিকা জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন এবং নীতি নির্ধারণ করা। এলাকার প্রধান অধিপতি এবং সব উন্নয়ন কাজের মূল নিয়ন্ত্রক হওয়া।
উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় বাজেটে নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করা। টিআর, কাবিখা ও ৪০ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচন।
স্থানীয় প্রশাসন প্রশাসনিক কাজে উপদেশ দেওয়া বা পরামর্শ দাতা হিসেবে থাকা। উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশের ওপর অলিখিত কিন্তু একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নীতিগত উন্নয়নে তদারকি করা। স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের গভর্নিং বডিতে নিজের বা অনুসারীদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা।
নিয়োগ ও চাকরি কোনো আইনগত নিয়োগ ক্ষমতা সরাসরি সংবিধানে দেওয়া নেই। ডিও লেটারের (DO Letter) মাধ্যমে স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগে আধিপত্য।
আইনি সুরক্ষা সংসদে বক্তব্য বা ভোটের জন্য আদালতে বিচারের ঊর্ধ্বে থাকা (অনুচ্ছেদ ৭৮)। রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সময় স্থানীয় বিবাদ বা সালিশি প্রথা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

আরও পড়ুন:

একজন সংসদ সদস্য বা এমপির ক্ষমতা ও কাজ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর-FAQ

প্রশ্ন: একজন সংসদ সদস্যের প্রধান বা মূল কাজ কী?

উত্তর: একজন এমপির প্রধান সাংবিধানিক কাজ হলো জাতীয় সংসদে বসে দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করা (Lawmaking), বিদ্যমান আইন সংশোধন করা এবং জাতীয় বাজেটের ওপর আলোচনা ও অনুমোদন দেওয়া।

প্রশ্ন:এমপি কি সরাসরি এলাকার রাস্তাঘাট বা ব্রিজ নির্মাণ করেন?

উত্তর: সরাসরি নিজ হাতে করেন না, তবে তিনি এলাকার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ আনেন এবং উন্নয়ন কাজের তদারকি করেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করে।

প্রশ্ন: 'ডিও লেটার' (DO Letter) কী এবং এটি কতটা শক্তিশালী?

উত্তর: ডিও লেটার হলো 'ডেমি অফিশিয়াল' লেটার। একজন এমপি যখন কোনো কাজের জন্য সুপারিশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন, তাকেই ডিও লেটার বলে। স্থানীয় পর্যায়ে বদলি বা প্রকল্প অনুমোদনে এটি অত্যন্ত প্রভাবশালী।

প্রশ্ন: স্থানীয় প্রশাসনে এমপির ক্ষমতা কতটুকু?

উত্তর: এমপি পদাধিকার বলে উপজেলা পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা। টিআইবি-র মতে, স্থানীয় ডিসি, এসপি এবং ইউএনও-র ওপর এমপিদের অলিখিত কিন্তু ব্যাপক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে।

প্রশ্ন: এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপির ভূমিকা কী?

উত্তর: এমপিরা সাধারণত এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শিক্ষক নিয়োগে প্রভাব রাখতে পারেন।

প্রশ্ন: টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে এমপির কাজ কী?

উত্তর: টেস্ট রিলিফ (TR) এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য (KABIKHA) প্রকল্পের বরাদ্দ কোথায় কতটুকু যাবে এবং কারা সুবিধা পাবে, তা মূলত এমপির অনুমোদনেই নির্ধারিত হয়।

প্রশ্ন: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এমপির ক্ষমতা কী?

উত্তর: এলাকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা ভিজিডি কার্ড কারা পাবেন, সেই তালিকা তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এমপির চূড়ান্ত প্রভাব থাকে।

প্রশ্ন: সংসদ সদস্য কি কাউকে গ্রেপ্তার করার আদেশ দিতে পারেন?

উত্তর: আইনগতভাবে তিনি পুলিশকে গ্রেপ্তারের সরাসরি আদেশ দিতে পারেন না, তবে আইনশৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি পুলিশকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।

প্রশ্ন: একজন এমপি কি এলাকার চাকরিতে নিয়োগ দিতে পারেন?

উত্তর: সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নেই, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় (বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে) এমপির সুপারিশ বা প্রভাব একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।

প্রশ্ন: সংসদে কোনো ভুল তথ্য দিলে বা কাউকে গালি দিলে কি এমপির বিচার হয়?

উত্তর: সংবিধানের ৭৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে দেওয়া কোনো বক্তব্য বা ভোটদানের জন্য কোনো এমপির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বা বিচার করা যায় না।

প্রশ্ন: সংসদ সদস্য পদ কি স্থায়ী?

উত্তর: না, সংসদ সদস্যের মেয়াদ সাধারণত ৫ বছর। তবে সংসদ ভেঙে গেলে বা তিনি পদত্যাগ করলে অথবা টানা ৯০ কার্যদিবস অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ বাতিল হতে পারে।

প্রশ্ন: এমপি কি আদালতের বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারেন?

উত্তর: সাংবিধানিকভাবে পারেন না। বিচার বিভাগ স্বাধীন, তবে স্থানীয় গ্রাম্য সালিশ বা বিবাদ মীমাংসায় অনেক সময় এমপিরা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন।

প্রশ্ন: একজন এমপি বছরে কত টাকা অনুদান পান?

উত্তর: সংসদ সদস্যগণ বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল পান, যা তিনি এলাকার দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় ব্যয় করতে পারেন।

প্রশ্ন: এমপি কি স্থানীয় সরকারের (চেয়ারম্যান/মেয়র) কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারেন?

উত্তর: স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী তিনি উপদেষ্টা, তাই সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কম থাকলেও রাজনৈতিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার কাজে তার মতামতের গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রশ্ন: দেশের জরুরি অবস্থায় এমপির ভূমিকা কী?

উত্তর: যুদ্ধ বা জরুরি অবস্থায় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করা এবং নিজ এলাকায় ত্রাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার অন্যতম দায়িত্ব।


এসআর