রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যু: বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে নতুন বিতর্ক ও শঙ্কা

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী
বিশেষ প্রতিবেদন
0

সত্তরের দশকে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে গিয়েছিলেন সৌদি আরব। ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এ জনগোষ্ঠী। কয়েকবছর ধরে সেসব রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে দেশটি। এবার ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে আবারও আলোচনায় বিষয়টি। এই সিদ্ধান্ত নতুন করে দীর্ঘমেয়াদী সংকট তৈরি করতে পারে বলছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশ্লেষকরা।

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব প্রবেশের অনুমতি পান। তখন পাকিস্তান থেকেও কিছু রোহিঙ্গা একই প্রক্রিয়ায় দেশটিতে যাবার সুযোগ পায়। ২০১০ সাল থেকে এসব রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নবায়ন করার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দেয়া শুরু করে দেশটি। নানা ধরনের সংকটে এই প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলে যায়। তবে বাংলাদেশি নথিপত্র থাকা রোহিঙ্গাদের দ্রুত পাসপোর্ট দেয়ার নির্দেশে আবারও আলোচনায় বিষয়টি।

সৌদি আরব বাংলাদেশ দূতাবাস সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, ‘পাকিস্তান থেকে যারা পাকিস্তানি পাসপোর্ট দিয়ে সৌদি আরব গেছে যে সব রোহিঙ্গারা তাদের পাসপোর্টের আগে বিআর (পাকিস্তানি রোহিঙ্গা) লেখা আছে। এভাবে তারা আইডেন্টিফাই করে কোন পাসপোর্টের তারা। তবে আমাদের বাংলাদেশ সেসময় যারা পাসপোর্ট ইস্যু করেছিলো তারা কোনো রকম মার্কিং রাখেনি।’

আরও পড়ুন:

২০২২ সালে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার হাতে পাসপোর্ট না থাকার কথা উল্লেখ করে সৌদি আরব। এরপর আওয়ামী সরকারের সিদ্ধান্তে জেদ্দা বাংলাদেশ কনস্যুলেট শুরু করে পাসপোর্ট প্রদান প্রক্রিয়া। আড়াই বছরে লাল-সবুজের এমআরপি পাসপোর্ট পায় ২১ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে পাসপোর্ট দেয়ার এই সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার কারণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন গবেষক ড. বেনুকা ফেরদৌসী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের এই পাসপোর্ট প্রাপ্তি বিষয়টি যদি একটি পুল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে, তাহলে তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবং দ্বিতীয়ত, অভিবাসী কর্মী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।’

মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, ‘আমরা নিজেদেরই বহুত ধরণের সমস্যায় জর্জরিত। তার ভেতরে এ আবার নতুন করে এই জর্জরিতটা বারবার কি আমরা এগুলা করবো? এটা কোন মতেই আমি মনে করি এই বিষয় নিয়ে দ্বিপাক্ষিক কথা বলা উচিত সরকারের এবং সরকারের একদম শক্ত থাকা উচিত।’

রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নতুন করে সংকট তৈরি করবে কিনা জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্যদেশের নাগরিকদের বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেয়া উচিত নয়। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘এটা কিন্তু গত সরকারের সময়ে এরকম কিছু ঘটনা ঘটেছিল যে রোহিঙ্গাদেরকে অন্য দেশ বা চাপের কারণে কিছু পাসপোর্ট দেয়া হয়েছিল। রোহিঙ্গারা তো আমাদের দেশের নাগরিক না। যারা আমাদের দেশের নাগরিক না তাদেরকে আমরা কেন পাসপোর্ট দেবো? এটা আমাদের একটা মৌলিক অবস্থান। আশা করি যারা দায়িত্বে আছেন তারা অবশ্যই সবকিছু বিচার বিবেচনা করেই একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।’

যাচাই বাছাইয়ের শর্তে দুই দেশ সম্মত থাকায় এই বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের দিকে এগুনোর পরামর্শ এই সাবেক কূটনৈতিকের। সংকট এড়াতে পাসপোর্ট দেয়ার সময় রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।

সৌদি আরব বাংলাদেশ দূতাবাস সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, ‘পাকিস্তান যেভাবে করেছে যে বিআর লিখে তারপর তারা পাসপোর্ট ইস্যু করেছে, আমাদেরও সেরকম একটা আইডেন্টিফাই করে তাদের পাসপোর্ট দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

তবে ভবিষ্যতে এই পাসপোর্টের অনুকূলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার চাহিদা বা জটিলতা তৈরি হবে কি-না এই শঙ্কাও করছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা।

এফএস