রাজধানীসহ দেশে তীব্র গ্যাস সংকট; চুলা নিভে যাচ্ছে, সিএনজিতে দীর্ঘ লাইন

এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি

এলএনজি
দেশে এখন
2

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাপ তৈরি হয়েছে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটির সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না।

মধ্যবাড্ডার এক বাসিন্দা বলেন, ‘সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ খুব কম। শুধু ভাত রান্না করতেই এক ঘণ্টা লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত গরম ভাত পান্তা বানিয়ে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে সবাই খেয়েছি।’

তিনি জানান, কয়েক দিন ধরেই সকালে গ্যাসের চাপ কম থাকছে। দুপুরে কিছুটা বাড়লেও রাতে আবার চাপ কমে যায়।

মিরপুরের বাসিন্দা চুমকি বলেন, ‘চুলায় গ্যাস নেই বললেই চলে। আগুন খুবই কম জ্বলছে। রান্না করতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার বা গভীর রাতে রান্নার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আরও পড়ুন:

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। কোথাও কোথাও ‘গ্যাস নেই’ নোটিশও টাঙানো হয়েছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদ খান বলেন, ‘সাধারণত স্টেশন পরিচালনার জন্য ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআই, এমনকি কোথাও ২ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে গেছে।’

হাজীপাড়ার একটি সিএনজি স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম মৃধা জানান, গভীর রাত ও ভোরে কিছুটা চাপ থাকলেও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।

অন্যদিকে, সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ‘অনেক এলাকায় চাপ ১ থেকে ২ পিএসআই হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না।’

ঢাকা জেলা সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় অনেক চালক দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না।’

শিল্পেও প্রভাব

গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য অন্তত ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন হলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সেই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। দুর্ঘটনার আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা কমে ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে বিভিন্ন খাতে সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।’

কী ঘটেছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে এলএনজি আমদানি ও পুনর্গ্যাসীকরণের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে সামিট, অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জি।

গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে গেছে।

বিদেশি বিশেষজ্ঞ আসছেন

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে আসছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেশে রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করলে দ্রুত টার্মিনাল সচল করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অপারেশন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অল্প সময়ের মধ্যেই টার্মিনালটি পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।’

তবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা পরিদর্শন শেষ করার পরই মেরামতকাজের সময়সীমা এবং গ্যাস সরবরাহ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছে?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট দেশের এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল থাকায় একটি বন্ধ হয়ে গেলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।

বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে না।’

এদিকে, কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট ও জনভোগান্তি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এনএইচ