আ.লীগ সরকার পতনের দুই বছর: বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিতে বাড়ছে বিভেদরেখা

রুহুল কবির রিজভী, মিয়া গোলাম পরোয়ার ও নাহিদ ইসলাম
রাজনীতি , বিশেষ প্রতিবেদন
দেশে এখন
1

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ২ বছর আজ। ঐতিহাসিক এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে বিভেদরেখা। ৩ দলের শীর্ষ নেতারাই মনে করেন, অভ্যুত্থানের প্রাপ্তি হিসেবে আওয়ামী সরকারের পতনই একমাত্র সফলতা। তবে, অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে জামায়াত-এনসিপি। যদিও, দায় নিতে নারাজ বিএনপি।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এক সময় রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনের শেষ দিকে, প্রকাশ্যেই যোগ দেয় বিএনপি-জামায়াত ও বর্তমান এনসিপির সেই সময়কার নেতারা। ৫ আগস্ট কাঙ্ক্ষিত সফলতাও আসে।

দুই বছর পরের ৫ আগস্টে, সেইসব রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের আওয়ামী শাসনামলের পতন ঘটিয়ে নতুন সরকারের ক্ষমতাগ্রহণই এই অভ্যুত্থানের বড় প্রাপ্তি।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘যে বিষয়টি মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছে, সেটি হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন করা। সেই নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসুক, তারাই দেশ পরিচালনা করবে। সে নির্বাচনটি হয়েছে, একটি রাজনৈতিক দল তারা ক্ষমতা পরিচালনা করছে।’

এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখন দেশে তো অনেক পরিবর্তন এসেছে, এটা তো সত্য। আপনি একটা নির্বাচন, সমালোচনা বা যেটাই হোক আপনি করতে পারছেন। বিরোধী দল আছে, পলিটিকাল ফ্রিডম আছে।’

তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর এক সময়কার একতা এখন অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নিয়েছে বিভেদে। কেনো এই ছন্দপতন? সেই প্রশ্নের জবাবে জামায়াত সেক্রেটারি দায় চাপান বিএনপি সরকারের ওপর। তিনি মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিলের কারণেই বিএনপি সরকারের সাথে দূরত্ব বাড়ছে জামায়াতের।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেন, ‘সরকার যে জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষরকারী একটা দল হিসেবে তার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটকে কীভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে? রাষ্ট্রপতির আদেশ যেটা ২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার হয়েছিল সংবিধান সংস্কার আদেশ। আদেশ জারির অব্যবহিত পরের নির্বাচনই হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে। তো তার ভিত্তিতেই তো ভোট হইছে। সেই ভোটে উনি প্রধানমন্ত্রী, উনারা এমপি, উনারা মন্ত্রী, সেই ভোটেই পার্লামেন্ট, সেই ভোটেই সরকার। উনারা ইগনোর করেন যে না এটা সংবিধানে নাই। তাহলে তো আপনি কিসে হইলেন কিসে?’

আরও পড়ুন:

অনেকটা একই উত্তর সরকার পতনের এক দফার ঘোষক ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর, বড় লক্ষ্য ছিলো শাসন কাঠামোরও পরিবর্তন। আর তা না হওয়ার জন্য দায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার, মনে করেন নাহিদ ইসলাম।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘অনেকেরই দায়, বিশেষ করে সেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যাদের সহযোগিতা আমরা চেয়েছিলাম ৫ই আগস্টের পরে, প্রধান দল হিসেবে যারা এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে, তাদের থেকে তো সেই সহযোগিতাটা সেই সময় আসেনি। তো তারা এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা তারাও বলছে, কিন্তু আদতে আপনি দেখবেন গণভোট হয়েছে জুলাই আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে, সে গণভোটের রায় তারা বাস্তবায়ন করে নাই। হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা হয়েছে, সেখানে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আপনারা পাবেন না।’

তবে, অভিযোগ মানতে নারাজ বিএনপি। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণভোটের রায় বিলম্বে হলেও বাস্তবায়ন করবে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেসব দূরত্ব দেখা যাচ্ছে, তার মূলে একে অন্যের প্রতি অসম্মানজনক বক্তব্য প্রদানকে দায়ী করেন তিনি ।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ডেমোক্রেটিক যে কাঠামো তার মধ্যে থেকেই আলোচনা-সমালোচনা সেটা করতে হবে। কিন্তু এই নর্মসটা ব্রেক করে গেলে, এটা ভেঙে গেলে পরে গণতন্ত্র আবার মুখ থুবড়ে পড়বে। আমরা কি বলেছি, কেউ বলেছেন যে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে না? কিন্তু জুলাই সনদ নিয়ে তো কথা বলতে হবে। আবার কথা বলতে হবে, আমরা সেটা আলোচনা করব। মানে সেটা কি করা যায়, এইভাবেই হবে নাকি অন্যভাবে হবে, সেটা তো ডিবেট, ডিসকাশন, আলোচনার মধ্যে দিয়ে একটা জায়গায় উপনীত হতে হবে। মানে এটা তো মানে বাড়ির মিলাদ না যে আমি শিন্নি দিয়ে দিলাম এখন চলে যাও।’

এদিকে, বিভেদ থাকলেও গঠনতান্ত্রিক উপায়েই সরকারবিরোধী আন্দোলনে জোর দেয়ার কথা জানান বিরোধী জোটের এই শীর্ষ দুই নেতা।

মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেন ‘নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করব, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব এবং জনগণকে আমরা সম্পৃক্ত করব। হাসিনা গেছে কিসে? সশস্ত্র আন্দোলনে? নো, পাবলিকের অপিনিয়ন।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জনগণের স্বস্তির কথাটা আমরা বেশি ভাবতেছি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। কিন্তু এটা অবশ্যই আমরা পরবর্তী ইলেকশনের জন্য আমরা এটাকে একটা এজেন্ডা বানাব যে বিএনপি গণভোট দেয় নাই—এরকম না। এটা আমরা যখন যত দ্রুত পারি আমরা মনে করি এটা আমাদের দায়িত্ব, এই সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে এই এই সংস্কারের কাজগুলা বাস্তবায়ন করা।’

এফএস