দিনাজপুরে দুই দিনে সাড়ে ৩৪৪ টন সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, ১ ব্যক্তিকে আটক ও দণ্ড

সারের ট্রাক
দেশে এখন
1

দিনাজপুরে সরকারি বরাদ্দের সার নিয়ে অনিয়ম ও অবৈধ মজুতের অভিযোগে পরপর দুই দিনে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ। এসব অভিযানে একটি হাসকিং মিলের গোডাউন থেকে ২১৭ বস্তা সার উদ্ধার করে এক ব্যক্তিকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিএডিসির সরকারি সার গোডাউন থেকে অনুমোদন ছাড়াই ৩২৭ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বিক্রির অভিযোগে এক স্টোরকিপারকে আটক করে মামলা করেছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার অবৈধভাবে মজুত ও অনুমোদন ছাড়া বিক্রির ঘটনায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। দুটি ঘটনায়ই আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আজ (বুধবার, ২৬ আগস্ট) দুপুরে দিনাজপুর শহরের পুলহাট এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি হাসকিং মিলে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিন শরিফের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে গোডাউনে বিপুল পরিমাণ সার মজুদের তথ্য পাওয়া যায়।

অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, গোডাউনে মজুত করা সার একটি ট্রাক্টরে করে বাইরে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। পরে গোডাউনে তল্লাশি চালিয়ে ২১৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়। জব্দ করা সার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার জিম্মায় দেয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার অবৈধভাবে মজুত করে পরে তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া বা বাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল। এর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।

এ ঘটনায় সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ অনুযায়ী মনোহর আলম নামে এক ব্যক্তিকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

আরও পড়ুন:

মনোহর আলম দিনাজপুর সদর উপজেলার রামসাগর এলাকায় খুচরা সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

সরকারি গোডাউন থেকে ৩২৭ টন সার বিক্রির অভিযোগ

এর আগে গত সোমবার রাতে সদর উপজেলার নশিপুর এলাকায় বিএডিসির সরকারি সার গোডাউনে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন ও কোতোয়ালী থানা পুলিশ। সরকারি গোডাউন থেকে অনুমোদন ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সার বিক্রির অভিযোগে স্টোরকিপার মো. আকতারুল ইসলামকে আটক করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকতারুল ইসলাম গত জুলাই ও আগস্ট মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই মোট ৩২৭ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে ২২৭ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১০০ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন এমওপি সার রয়েছে।

এ ঘটনায় বিএডিসির দুই চুক্তিবদ্ধ ডিলার; বীরগঞ্জ উপজেলার সোহাগ হোসেন ও কাহারোল উপজেলার আনসারুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে। বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) খুরশিদ আলম বাদী হয়ে দিনাজপুর কোতোয়ালী থানায় মামলা করেছেন।

বিএডিসি সূত্র জানায়, নশিপুরে ‘কাঞ্চন’ ও ‘স্টিল’ নামে দুটি গোডাউন রয়েছে। এসব গোডাউনের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি সার মজুত করা হয়।

পুলিশ বলছে, সরকারি গোডাউন থেকে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ সার অনুমোদন ছাড়া বিক্রি হলো, এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না এবং বিক্রির অর্থ কোথায় গেছে—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

দিনাজপুর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নূরনবী বলেন, ‘এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পরপর দুই ঘটনায় মোট ৩২৭ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সরকারি সার বিক্রির অভিযোগ এবং ২১৭ বস্তা সার অবৈধভাবে মজুতের ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে জেলার সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে সরকারি গোডাউন থেকে অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ সার বের হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, স্টক রেজিস্টার, ডেলিভারি চালান, ডিলারদের বরাদ্দ ও বিক্রির হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম হলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। বিশেষ করে মৌসুমে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। তাই সরকারি সার মজুত, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে নথিপত্র যাচাই এবং নজরদারি জোরদার করা জরুরি।

প্রশাসন ও পুলিশের এসব অভিযান অবৈধ মজুদ ও অনুমোদনহীন বিক্রির বিরুদ্ধে চলমান তৎপরতার অংশ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এফএস