দিনভর বিক্ষোভ; মজুরি বোর্ড হচ্ছে রোববার

আরিফুল হক চৌধুরী
দেশে এখন
1

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের নতুন মজুরি নির্ধারণে আগামীকাল (রোববার, ১ নভেম্বর) মজুরি বোর্ড গঠন করবে সরকার। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে টানা পাঁচ ঘণ্টা আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।

তবে এর মধ্যেও শনিবার দিনভর সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা গেছে। আশুলিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ২০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, কালিয়াকৈরে একই দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

আজ (শনিবার, ৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিজয়নগরের শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রী।

পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি মেনে নিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়।

শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা মজুরি বোর্ড গঠনে রাজি। তাই এ বিষয়ে বিরোধ থাকবে না।’

শ্রমিকদের প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন দেয়া এবং বকেয়া পরিশোধের বিষয়েও দুই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

তার ভাষ্য, মালিকদের সঙ্গে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় ভাঙচুর বা কারখানা বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে মালিকপক্ষ অর্থ পাবে না। এতে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে।’

এসময় বাইরে থেকে কিছু লোক এসে শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে বলে অভিযোগ করেন আরিফুল হক চৌধুরী। প্রকৃত শ্রমিক কারা এবং কারা আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, তা ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিমসহ অন্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আজ দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর, কাঠগড়া, জিরাবো ও নরসিংহপুর এলাকা ঘুরে থমথমে পরিস্থিতি দেখা যায়। ৩০ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত না করা এবং অহেতুক ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে সেখানে অসন্তোষ চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

একই দাবিতে দুপুরের পর গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন পোশাক শ্রমিকেরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে ন্যূনতম বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। পরে আশপাশের অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকেরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার যাত্রীসহ সাধারণ মানুষ ও পরিবহনচালকরা দুর্ভোগে পড়েন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। তবে বিক্ষোভকারীরা অবস্থানে অনড় থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশপাশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল দেওয়ার পর থেকেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালে সর্বশেষ তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা হয়েছিল সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। তবে শ্রমিকদের দাবির তুলনায় এই মজুরি ছিল অর্ধেক। এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে, কিন্তু ন্যূনতম মজুরি আর বাড়েনি।

গত ৪ অক্টোবর তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি বাড়াতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে শ্রমমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয় শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)।

সংগঠনটি জানায়, বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করেছে। চলতি বছরের নভেম্বরে সর্বশেষ নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির তিন বছর পূর্ণ হবে। নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর করার সময় ঘনিয়ে এলেও সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়নি। এ কারণে মজুরি বোর্ড গঠন না হওয়ায় পোশাক শ্রমিকেরা উদ্বিগ্ন।

এরপর থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন করছিলেন শ্রমিকরা। ১৪ অক্টোবর বেতন বাড়ানোর দাবিতে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেছিলেন। ওই দিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে মহাসড়ক ও আশপাশের বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

পরদিন ১৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র আয়োজিত সেমিনারে নতুন মজুরিকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান বামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদেরা।

জেআর