কাগজে থাকলেও রাস্তায় নেই বাস; ঋণের ভারে ডুবছে বিআরটিসি

বিআরটিসি বাস
বিশেষ প্রতিবেদন
0

খাতা-কলমে আছে, বাস্তবে নেই দশা বিআরটিসি বাসের। ঢাকায় বিআরটিসি ৬শ' বাসের মধ্যে ভাড়ায় খাটে ৪৫০টি বাস। শতশত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কেনা এসব বাস কয়েক বছরের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, স্টাফ বাসে অলস বসে থাকাসহ নানা অনিয়মে লাভের মুখ দেখছে না বিআরটিসি।

রাজধানীর প্রখর রোদে বিআরটিসি বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা মুরশিদ মিয়া ও তার পরিবারের। চোখেমুখে ক্লান্তি। গন্তব্য বাড্ডা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাসের দেখা পেয়ে যেন স্বস্তি পেলেন।

রাস্তায় এ রাষ্ট্রীয় গণপরিবহনের দেখা পাওয়া যেন অনেকটা চাঁদ হাতে পাওয়ার মত। এ নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে রয়েছে চরম হতাশা।

কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ১০ মিনিট পর পর বাস ছাড়ার কথা, সেখানে ৪০ মিনিট ৫০ মিনিট লেট করে ছাড়ে। বাসে ভালো ফ্যান নাই খুবই খারাপ অবস্থা। এছাড়াও যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানো নামানোর অভিযোগও করেন তারা।

সারাদেশে বিআরটিসির ১১৫০টি বাসের মধ্যে ৬০ শতাংশ শুধু ঢাকাতেই চলাচল করে। এতে করে রাজধানীর রাস্তায় খুব বেশি বিআরটিসি বাসের সংকট থাকার কথা নয়। কিন্তু তারপরও বিআরটিসি বাস স্বল্পতা নিয়ে যাত্রীদের এতো অভিযোগ কেন? তথ্য বলছে, ঢাকায় চলাচল বিআরটিসি ৬০০ বাসের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, বিমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাড়ায় খাটে ৪৫০টি বাস। যেগুলোকে তারা বলছেন স্টাফ বাস।

বাকি দেড়শ বাসের মধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে ৭০টি বাস আর রাজধানীর সাথে আন্তঃজেলা চলাচল করে ৮০টি বাস। অর্থাৎ ২ কোটি মানুষের এ মেগা সিটিতে সাধারণ যাত্রী পরিবহনে বিভিন্ন রুটে রাষ্ট্রীয় এ গণপরিবহন চলে মোটেই ৭০টি।

যাত্রী সেবায় উদাসীনতা থাকলেও বড় বড় প্রকল্প বাগিয়ে বাস কেনার ক্ষেত্রে যেন সংস্থাটির জুড়িমেলা ভার। যার আবার সবগুলো কেনা হয়েছে ঋণ করে। ১২শ কোটি টাকার এ ঋণে লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ভারতের কাছ থেকেই দুই ধাপে নেওয়া হয়েছিল ৯০৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাকি ৩৯১ কোটি টাকার ঋণ দেয় নরডিক ডেভেলপমেন্ট ও ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ড।

আওয়ামী সরকারের আমলে মোট এ ৪ প্রকল্পে বিআরটিসি বাস কেনা হয় ১ হাজার ৫৬৮টি। মাত্র কয়েক বছরে অধিকাংশ বাসগুলোর জানালা ভাঙা, সিট ছেঁড়া, অকেজো ইঞ্জিন। এ বাসগুলো অবহেলা, অযত্নে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ডিপোগুলোতে। যেন দেখার কেউ নেই। ভঙ্গুর এ বাসগুলোর ছবি নিতে মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে গেলে ড্রাইভার, হেলপার ও স্টাফরা এসে মব তৈরির চেষ্টা করে।

আরও পড়ুন:

প্রশ্ন হচ্ছে, নিজস্ব ওয়ার্কশপ ও শতশত কর্মী থাকার পরও গত ১০-১২ বছরে নতুন নতুন বাস বহরে যুক্ত হলেও সেগুলো কেন দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় কেনা গাড়িগুলো কি আদৌ লাভজনক হতে পেরেছে? সাধারণ যাত্রী পরিবহনেই কেন এত অনাগ্রহ তাদের?

বিআরটিসির অপারেশনস বিভাগের পরিচালক মো. রাহেনুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে যাত্রী নেমে যাওয়ার পর যে আরেকটা ট্রিপ দিতে হয় আমরা সেটা দিতে পারিনা। যানজটের কারণে আমাদের বসে থাকতে হয়। সরকার থেকে তো আমাদের কাছে কোনো সাহায্য সহযোগিতা আসে না। বাস অপারেট করে আমাদের চলতে হয়। বেশি টাকা লাগে। ওই পরিমাণ অর্থ আমাদের নাই রিপেয়ার করার মতো।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, স্টাফ বাসে অলস বসে থাকাসহ নানান অনিয়মে লাভের মুখ দেখছে না বিআরটিসি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. এম হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যখন বাসগুলো অলস বসে আছে তখন যদি সুষ্ঠুভাবে এফিশিয়েন্সি দিয়ে পরিচালনা করতে পারে এবং আয়-ব্যয়ের হিসেবে স্বচ্ছতা থাকে তাহলে উন্নতি সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘আধুনিক সব রাষ্ট্রে বিশেষ করে সরকারি যেসব পরিবহন ব্যবস্থা আছে তাদের কিন্তু একটা ফ্লিট ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম আছে। যেখানে আসলে ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতার কোনো ঘাটতি থাকে না।’

সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া বিআরটিসিকে লাভজনক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এছাড়া, স্টাফ বাসে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে সাধারণ যাত্রীসেবায় জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

এএইচ