পশু জবাই কেন নিয়মবদ্ধ ও আল্লাহর নামে হওয়া আবশ্যক (Why Slaughtering Must Be in the Name of Allah)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন: “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা হয়েছে।” (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, জবেহ করার পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তবে সেই খাদ্য মোটেও হালাল নয়। তাই পশু জবাই কেবল ছুরি চালানোর কাজ নয়; এটি একটি পবিত্র ইবাদত (Sacred Act of Worship)।
আরও পড়ুন:
পশু জবাই সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্তসমূহ (Essential Conditions for Halal Slaughtering)
ইসলামি ফিকহ (Islamic Jurisprudence) অনুযায়ী পশু জবাই সহিহ বা শুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রধান ৩টি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি:
১. জবাইকারীর যোগ্যতা (Eligibility of the Slaughterer): জবাইকারীকে অবশ্যই মুসলমান অথবা আহলে কিতাব (People of the Book) হতে হবে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫)
২. আল্লাহর নাম উচ্চারণ (Pronouncing Allah's Name): জবাইয়ের সময় মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা আবশ্যক। ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিসমিল্লাহ’ না বললে সেই প্রাণীর গোশত খাওয়া বৈধ হবে না। আল্লাহ বলেন, “যে জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় না, তা খেয়ো না।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১২১)
৩. ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার (Using a Sharp Knife): পশুকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যখন জবাই করো, তখন সুন্দরভাবে জবাই করো; ছুরি ধারালো করো (Sharpen the Knife) এবং পশুকে কষ্ট দিও না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
আরও পড়ুন:
জবেহ করার সময় কাটা আবশ্যক ৪টি অঙ্গ (4 Essential Vessels to be Cut During Slaughtering)
ফিকহবিদদের মতে, দ্রুত ও কষ্টহীন মৃত্যুর জন্য জবাইয়ের সময় পশুর গলার নিচের ৪টি অঙ্গ বা রগের মধ্যে অন্তত ৩টি কাটা আবশ্যক:
- শ্বাসনালি বা গলা (Halkum / Windpipe)
- খাদ্যনালি (Esophagus / Gullet)
- দুই পাশের প্রধান রক্তনালি বা রগ (Jugular Veins / Carotid Arteries)
ইমাম নববি (র.) বলেন, এই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পশুর রক্ত দ্রুত ও সম্পূর্ণ বের হয়ে যায় (Rapid Blood Drain), যা পশুর কষ্ট কমায় এবং মাংসকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মুক্ত ও সম্পূর্ণ নিরাপদ করে। (শারহ সহিহ মুসলিম)
পশু জবাই করার সুন্নাহ দোয়া ও নিয়ত (Dua and Intention for Animal Slaughtering)
পশু জবেহ করার মূল মুহূর্তে আল্লাহর নাম নেওয়া ফরজ বা অপরিহার্য। তবে নিচের দোয়াটি পড়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ (Sunnah Ritual):
জবাইয়ের মূল দোয়া: بِسْمِ اللهِ اَللهُ اَكْبَرُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সবচেয়ে মহান (In the name of Allah, Allah is the Greatest)।
আরও পড়ুন:
কোরবানির সময় অতিরিক্ত সুন্নাহ দোয়া (Special Eid Qurbani Dua): কোরবানির পশু জবেহ করার সময় এই অংশটুকু পড়া সুন্নাত— "আল্লাহুম্মা হাজা মিনকা ওয়া লাকা" (হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকেই এসেছে এবং তোমার জন্যই উৎসর্গীকৃত)।
পশুর প্রতি দয়া ও মানবিকতার ইসলামি শিক্ষা (Animal Welfare and Kindness in Islam)
ইসলাম পশুদের প্রতি সর্বোচ্চ দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার লক্ষ্য করলেন, এক ব্যক্তি পশুর সামনেই ছুরি ধার দিচ্ছে। তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “তুমি কি তাকে দু’বার হত্যা করতে চাও?” (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস: ৭৫৭৩)। তাই পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা কিংবা টেনে-হেঁচড়ে পশুকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ (Strictly Prohibited in Islam)।
একনজরে পশু জবেহ করার ইসলামি শর্ত ও রগ কাটার নিয়ম (Quick Table Summary: Slaughtering Rules)
মূল বিষয় (Core Aspect)
ইসলামি ও শরিয়তের বিধান (Shariah Guidelines)
পঠিতব্য দোয়া (Recitable Dua)
কাটা আবশ্যক অঙ্গ (Vessels to Cut)
হালাল জবেহ (Halal Slaughter)
জবাইকারী মুসলিম হবে, অস্ত্র অত্যন্ত ধারালো হতে হবে এবং পশুকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার
শ্বাসনালি, খাদ্যনালি ও ২টি রক্তনালির মধ্যে অন্তত ৩টি
কোরবানির পশু জবেহ করার নিয়ম ও মাসয়ালা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর-FAQ
প্রশ্ন: পশু জবাই করার সময় কোন দোয়াটি পড়া আবশ্যক এবং কোরবানি কবুলের সুন্নাহ দোয়াটি কী?
উত্তর: পশু জবেহ করার মূল মুহূর্তে আল্লাহর নাম নেওয়া ফরজ। ছুরি চালানোর সময় বলতে হবে "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" (আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সবচেয়ে মহান)। কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে এই মূল দোয়ার পর অতিরিক্ত হিসেবে এই সুন্নাহ দোয়াটি পড়া উত্তম: "আল্লাহুম্মা হাজা মিনকা ওয়া লাকা" (হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকেই এসেছে এবং তোমার জন্যই উৎসর্গীকৃত)। এরপর নিজের বা যার পক্ষে কোরবানি করা হচ্ছে তার নাম মনে মনে নিয়ত করতে হবে।
প্রশ্ন: পশু জবেহ করার সময় গলার কোন কোন রগ কাটা জরুরি?
উত্তর: ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, জবেহ সফল ও হালাল হওয়ার জন্য পশুর গলার প্রধান ৪টি নালি বা রগের মধ্যে অন্তত ৩টি কাটা আবশ্যক। এই ৪টি অঙ্গ হলো:
- শ্বাসনালি (Halkum)
- খাদ্যনালি (Esophagus)
- দুই পাশের দুটি প্রধান রক্তনালি (Jugular Veins)
এই পদ্ধতিতে জবেহ করলে পশুর মস্তিষ্ক সচল থাকা অবস্থাতেই শরীর থেকে দ্রুত সব রক্ত বের হয়ে যায়, যা পশুর কষ্ট কমায় এবং মাংসকে জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখে।
প্রশ্ন: পশুর প্রাণ সম্পূর্ণ বের হওয়ার আগেই কি চামড়া ছিলা বা পা কাটা জায়েজ?
উত্তর: না, এটি সম্পূর্ণ মাকরূহ এবং পশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা। জবেহ করার পর পশুটি সম্পূর্ণ শান্ত হওয়া এবং তার প্রাণ পুরোপুরি বায়ু বের হয়ে যাওয়ার আগে কোনোভাবেই চামড়া ছাড়ানো, পা কাটা বা ঘাড় মটকানো যাবে না। পশুর শরীরে তখনও প্রাণ থাকলে তা তাকে জীবন্ত অবস্থায় অঙ্গচ্ছেদ করার মতো তীব্র কষ্ট দেয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: এক পশুর সামনে অন্য পশুকে শোয়ানো বা জবেহ করার বিধান কী?
উত্তর: এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবেহ করা কিংবা পশুর সামনেই ছুরি ধার দেওয়া শরিয়ত মোতাবেক অত্যন্ত অপছন্দনীয় বা মাকরূহ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে পশুর সামনে ছুরি ধার দিতে দেখে বলেছিলেন, "তুমি কি পশুটিকে দু'বার হত্যা করতে চাও?" তাই পশুকে জবাইয়ের স্থানে নেওয়ার আগেই ছুরি ধার দিয়ে নিতে হবে এবং একটি পশুর চোখের আড়ালে অন্য পশুকে জবেহ করতে হবে।
প্রশ্ন: জবেহ করার সময় মুখে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে কি সেই মাংস হালাল হবে?
উত্তর: যদি কোনো মুসলমান জবেহ করার সময় ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে যান, তবে ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেই পশুর মাংস হালাল হবে এবং তা খাওয়া জায়েজ। কারণ একজন মুমিনের অন্তরে সবসময় আল্লাহর নাম থাকে। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম নেওয়া ছেড়ে দেয়, তবে সেই পশুর মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
আরও পড়ুন:





