সমন্বিত কৃষিতে বদলাচ্ছে পাহাড়; স্বপ্ন দেখছেন দুর্গম এলাকার মানুষ

রাঙামাটি
পাহাড়ি বাজার, জমি থেকে ফসল তুলে নদী পার হচ্ছেন একজন নারী কৃষক
কৃষি
বিশেষ প্রতিবেদন
0

জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করে দুর্গম পাহাড়ে বাঁচার লড়াই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর। আছে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতের অনিশ্চয়তাও। তবে সমন্বিত কৃষি উদ্যোগের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলে বদলে যাচ্ছে সে চিত্র। টেকসই কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত ও দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন বুনছেন এ অঞ্চলের মানুষ। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাহাড়ের কৃষি ব্যবস্থা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ চালু রাখা জরুরি।

সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা রাইংখ্যং নদী। জলপথ পেরুলেই নিভৃত পাহাড়ি জনপদ পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিলাইছড়ি। নদী-পাহাড়কে সঙ্গী করেই এক নিবিড় মিতালী এখানকার মানুষের।

আছে নানা সংকটের গল্প। বিশেষ করে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, পাহাড়ি বন্যা মোকাবেলা করেও কৃষিতে ঘটেছে সবুজ বিপ্লব। বিশেষ করে পাহাড়ের নারীদের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে এখানকার কৃষি খাত।

এ উপজেলার প্রান্তিক অঞ্চল কেয়াজনছড়ি। এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, বীজ সংরক্ষণ করে হচ্ছেন স্বাবলম্বী। মেটাচ্ছেন পারিবারিক পুষ্টির চাহিদাও।

পাহাড়ের নারীদের মাঝে একজন বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে বেগুন, এই যে সিমের, পুঁইশাকের বিচি—এগুলি বিক্রি করে সপ্তাহে কত দৈনিক আমাদের খাওয়ারও হয়, খরচও হয় কিছু।’

আরও পড়ুন:

অন্য একজন বলেন, ‘বেচার পাশাপাশি ওই বার্মিজ কম্পোস্ট, আম, মরিচ আর ওই ইয়ে শাক-সবজি এগুলো করি।’

দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার মাঝেও পাহাড়ের নারীরা আগলে রেখেছেন উন্নত কৃষি ব্যবস্থা। নিজেদের প্রয়োজনে ঘরোয়া পদ্ধতিতে করছেন দেশিয় বীজ সংরক্ষণ, চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অর্থনৈতিকভাবেও।

নারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘যে বীজগুলো হারাতেছি, আমরা সেই বীজগুলো যত্ন করে রাখতেছি, যেন ভবিষ্যতে আবার আমরা পেয়ে যাই এই বীজগুলো।’

অন্য একজন বলেন, ‘চাষবাস করে তারপর ওগুলা আমরা বীজগুলো সম্পূর্ণ ভালো করে সংরক্ষণ করি।’

আধুনিক এবং বাণিজ্যিক কৃষির প্রসার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন জাতের ফসলের বীজ বিলুপ্তপ্রায়। এমন বাস্তবতায় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পাহাড়ে বসবাসকারী নারীরা প্রাকৃতিকভাবে এমন অনেক ফসলের বীজ সংরক্ষণ করছেন।

আরও পড়ুন:

পার্বত্য এলাকার টেকসই কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত ও দারিদ্র দূরীকরণে নতুন আশার আলো জ্বেলেছে পিআরএলসি প্রকল্প। ২০২৩ সাল থেকে এই প্রকল্পের আওতায় দুই হাজারের অধিক পরিবার পাচ্ছেন সহায়তা। এর অংশ হিসেবে প্রান্তিক পরিবারগুলোকে দেয়া হয় হাতে-কলমে ক্লাইমেট স্মার্ট চাষাবাদ ও ফসল সংরক্ষণের পরামর্শ।

নারী কৃষকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আগে তো তবে চাষবাস করতাম, আমরা পাহাড়িরা প্রায় আদিকাল মানুষ হতে তো চাষবাস করতো। এখন আবার চাষবাস করলেও এভাবে বুঝতাম না, এখন তো প্রশিক্ষণে শিক্ষিত হয়ে আরও ভালো বুঝে গেছি।’

অন্য একজন বলেন, ‘২০ হাজার টাকা পাইছি, ওই টাকা দিয়ে তিনটা ছাগল কিনছি। এখন বর্তমানে তিনটা ছাগল কিনে আবার সাতটা হয়ে গেছে আরকি।’

বস্তায় আদা চাষ, সবজি থেকে শুরু করে ভার্মিকম্পোস্ট, এমনকি গবাদিপশু পালন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহায়তায় ‘পার্টনারশিপ ফর রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন সিএইচটি রিজিয়ন’ (পিআরএলসি) প্রকল্প মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে হিল ফ্লাওয়ার।

আরও পড়ুন:

হিল ফ্লাওয়ারের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর জ্যোতি বিকাশ চাকমা বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে খামার যাচাই-বাছাই, তারপর হচ্ছে এই ভার্মিকম্পোস্ট সার এগুলো তৈরির ব্যাপারে আমরা ওদেরকে উৎসাহিত করি। তাছাড়া আমরা কিন্তু এই সুফলভোগীদের কথা মাথায় রেখে, যেহেতু আমরা খুব দূর-দূরান্তে থাকি, বাজারের যে আসা-যাওয়া এবং যে কৃষি পণ্য ওদেরকে আনতে অনেক কষ্ট হয়, সেক্ষেত্রে অনেক সুফলভোগী বর্তমানে মার্কেট কালেকশন পয়েন্ট—আমরা একটা নতুন মার্কেট কালেকশন করেছি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় নানা প্রাকৃতিক সংকট মোকাবিলা করে কৃষি খাতে সফল হচ্ছেন নারীরা। সমন্বিত সহায়তায় উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করা গেলে বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রা।

রাঙামাটি বিলাইছড়ির কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, ‘পাহাড়ে আপনার প্রধান সমস্যা হলো সেচের সমস্যা। যে কারণে আপনার অনেক কৃষি জমি পতিত থাকে। তো ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে হঠাৎ করে সাডেন ফ্লাড হয়। তো এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে গেলে সমন্বিত কাজ করতে হবে। এখানে এনজিও হোক, সরকারি দপ্তরই হোক সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে কাজ করতে হবে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে।’

উন্নয়ন সংস্থাগুলো বলছে, পার্বত্য এলাকার পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য সমন্বিত মডেল অনুসরণ করে নানা উদ্যোগ চলমান। নিরাপদ জীবিকা নির্বাহ ও আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে জোর দেয়ার তাগিদ তাদের।

আরও পড়ুন:

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর নিখিল চাকমা বলেন, ‘সরকারি দিক থেকে সাপোর্টটা কিন্তু খুবই কম। ফলে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, আধুনিক যে চাষাবাদ পদ্ধতি, সেগুলো তাদের কাছে দুর্গমতার কারণে জ্ঞানগুলো বা ওই টেকনোলজিগুলো তাদের কাছে যায় না। তাদেরকে আমরা আধুনিক কৃষি যে ব্যবস্থাগুলো এবং পাশাপাশি তাদের ট্র্যাডিশনাল যে নলেজগুলো আছে—দীর্ঘদিন ধরে তারা যেগুলো প্র্যাকটিস করছে, তাদেরকে কৃষি ব্যবস্থার পুরো বিষয়গুলো আমরা তাদেরকে অবহিত করেছি।’

এদিকে পাহাড়ে কৃষি উৎপাদন ও বাজারজাত সহজীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. কাশফিয়া আহমেদ বলেন, ‘বিপুল নারীরা যারা পাহাড়ি এলাকায় কাজ করছেন এবং পাহাড়ের যে ফসল থেকে এখানে তো জুম চাষে শুধুমাত্র ফসল হয় না, আদা, হলুদ খুবই এখানে পপুলার, এখন সমতলেও চলে আসছে পাহাড়ি আদা, পাহাড়ি মসলা আপনি দেখবেন খুব বাজারে বিক্রি হচ্ছে পাহাড়ি হলুদ। তাদেরকে আরও উৎসাহিত করার জন্যে, সরাসরি তাদের ইনভলভমেন্ট আরও বাড়াতে চাই এবং তাদেরকে মূল্যায়ন করতে চাই। সেক্ষেত্রে এই যে এখন যেমন কৃষক কার্ড হচ্ছে, সেই কার্ডের মধ্যে পাহাড়ি নারীদের—শুধু পাহাড়ি নারী বলবো না, আমি সব নারী কৃষকদের জন্যই বলবো—তাদের জন্য একটা কার্ডের সিস্টেম হতে পারে।’

আরও পড়ুন:

পাহাড়ের নারীরা তাদের নীরব শ্রম দিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন পাহাড়ের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেই সঙ্গে মেটাচ্ছেন পুষ্টির চাহিদাও। তাদের এই সংগ্রামের স্বীকৃতি আর সহায়তা দেয়াই এখন বড় লক্ষ্য বলে মনে করছেন এখানকার নারীরা।

এসএস