বর্তমানে ফরিদপুরের বিভিন্ন হাটে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের পকেট থেকে গড়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা! অর্থাৎ প্রতি মণে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লোকসান দিয়ে মূলধনটুকুও ঘরে তুলতে পারছেন না চাষিরা।
চাষিদের এই দুর্দশার পেছনে মূলত বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবকে দায়ী করছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত আদর্শ কৃষাণি সাহিদা বেগম। ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত হিমাগার বা গুদাম না থাকায় পচনশীল এই পণ্য ধরে রাখতে পারছেন না কৃষকেরা।
সালথা উপজেলার চাষি সেলিম মাতুব্বর ও সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বীজ, সার, কীটনাশক, ডিজেল আর শ্রমিকের মজুরি এখন আকাশছোঁয়া। অথচ ফসল বেচতে গেলে দাম নাই। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে বাজারে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না।’ একই সুরে বোয়ালমারীর কৃষক শেখ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বছরের পর বছর এভাবে লোকসান দিলে কৃষকেরা পেঁয়াজ চাষই ছেড়ে দেবে।’
আরও পড়ুন:
ফরিদপুর কৃষক সমিতির নেতা অ্যাড. মালিক মজুমদারের মতে, পেঁয়াজের বাজারে এই ধস পুরো জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে। কারণ সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালীর হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই চাষের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের পকেটে টাকা না থাকলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও মন্দা নামবে।
কানাইপুরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান মোল্লাহ এবং ফরিদপুর শহরের আনন্দ সাহা জানান, বাজারে এবার রেকর্ড উৎপাদন হওয়ায় সরবরাহ অনেক বেশি, যার কারণে দাম পড়ে গেছে। তবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই বাঁচতেন।
চাষিদের এই সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি অ্যাড. শিপ্রা গোস্বামী।
আরও পড়ুন:
তবে সরকারি উদ্যোগে কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছেন ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান। তিনি জানান, কৃষকদের পেঁয়াজ ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩০টি এবং ২০২৬ সালের শুরুতেই ৭০০টি ‘এয়ারফ্লো মেশিন’ বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছরে আরও ২ হাজার ৫০০টি মেশিন দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
কৃষিবিদ আনোয়ার হোসেনের মতে, এ সংকট কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক সতর্কবার্তা। তাই মাঠপর্যায়ের কৃষকদের বাঁচাতে অবিলম্বে সরকারিভাবে সরাসরি পেঁয়াজ কেনা, আধুনিক হিমাগার স্থাপন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ফরিদপুরের ভুক্তভোগী চাষিরা।





