নারায়ণগঞ্জবাসীর বসবাস যেন গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে!

অ্যাম্বুলেন্স
এখন জনপদে
0

নারায়ণগঞ্জবাসীর যেন বসবাস অনেকটা যেন গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে। আতংক কখন যেন গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটে। বাসাবাড়ি, সড়ক, ড্রেন, এমনকি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও ঘটছে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ। অধিকাংশ ঘটনায় দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ২৭৫টি ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আহত ও নিহতের সঠিক পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তবে গত দেড় বছরে বাসাবাড়িতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ১২ জনের মৃত্যুর একটি পরিসংখ্যান বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার ঘটছে এমন দুর্ঘটনা? কোথায় দুর্বলতা? আর দায় কার?

একের পর এক এসব দুর্ঘটনায় আতংকিত নারায়ণগঞ্জ নগরীর বাসিন্দারা। এসব দুর্ঘটনার জন্য নগরবাসী দায়ী করছেন তিতাসগ্যাসকেই। তারা বলছেন তিতাসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিভিন্ন ঠিকাদাররা অবৈধ সংযোগ দিচ্ছেন। যেখানে ব্যাবহার করা হচ্ছে নিন্মমানের সামগ্রী। এতে করে কিছুদিন না যেতেই পাইপলাইনে লিকেজ দেখা দেয়। এসব বিষয়ে তিতাসগ্যাস কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর জোর দাবি জানান তারা।

এসব বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি নারায়ণগঞ্জের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহা এখন টিভিকে জানান, পুরনো লাইনের সংস্কার ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করনের কাজ চলছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানান তিনি।

পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, ‘এসব দুর্ঘটনার জন্য শুধু কোনো সংস্থা একা দায়ী নয়, অনেকাংশে দায়ী ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা। অনেক সময় চুলা ও সিলিন্ডারের চাবি ভালো করে বন্ধ না করা, রান্নাঘরের জানালা খোলা না রাখা, যার কারণে গ্যাস বদ্ধ ঘরে জমে চেম্বারের সৃষ্টি করে। যার কারণে কোনোভাবে আগুনের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরী।’

আরও পড়ুন:

প্রায় একই পরামর্শ ফায়ার সার্ভিসেরও। ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ উপ-সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফিন এখন টিভিকে জানান, গ্যাসের গন্ধ পেলেই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা যাবে না। দ্রুত দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাসলাইন পরীক্ষা, মেয়াদোত্তীর্ণ চুলা ও রেগুলেটর পরিবর্তন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

এ দিকে সবশেষ গত ১১ মে ফতুল্লার কুতুবপুর লাকী বাজার এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে বাবা ছেলেসহ চারজন দগ্ধ হয়। এর একদিন আগে ১০ মে সকালে ফতুল্লার উত্তর ভূইগড়ের গিরিধারা এলাকার একটি ৮ তলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগে। এতে একই পরিবারের শিশু সন্তানসহ ৫ জন দগ্ধ হন। পরদিন সকাল দগ্ধদের মধ্যে সবজি বিক্রেতা কালাম চিকিৎসাধীন মৃত্যুবরণ করেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ৮ জন দগ্ধ হন। পরে শিশুসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়।

একই বছরের ২৩ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকায় গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে আগুনে দগ্ধ হন এক মাস বয়সী শিশুসহ একটি পরিবারের ৯ সদস্য। ঘটনার একদিন পর মারা যায় শিশু ইমাম উদ্দিন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার মা সালমা বেগম, বাবা হাসান, নানী তাহিরা খাতুন, খালা আসমা বেগম, খালাতো ভাই আরাফাত ও খালাতো বোন তৃষা আক্তার। মর্মান্তিক এই ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ৭ জন।

আরেক ঘটনায় গত বছরের ৬ ডিসেম্বর সোনারগাঁয়ে রান্নার চুলার গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন দগ্ধ হন।

শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই ঝুঁকি। চলতি বছরের ৭ মার্চ নগরীর পশ্চিম দেওভোগ এলাকায় একটি ঝুটের গুদামে তিতাস গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ৩ জন দগ্ধ হন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় একটি তিনতলা ভবনের দেয়াল ধসে পড়ে এবং পাশের চারজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটির পর একটি দুর্ঘটনা প্রমাণ করছে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসলাইন নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ লাইন শনাক্ত ও সংস্কারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।

প্রতিবার দুর্ঘটনার পরই আসে নানা আশ্বাস। কিন্তু দুর্ঘটনা থামছে না। প্রশ্ন একটাই, আর কত প্রাণ গেলে নিরাপদ হবে নগরীর গ্যাস ব্যবস্থা?

এফএস