শ্রমিক আন্দোলনে দিনভর উত্তপ্ত শিল্পনগরী গাজীপুর, কারখানা বন্ধ ঘোষণা

সড়কে শ্রমিকদের অবস্থান
এখন জনপদে
0

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভে দিনভর উত্তপ্ত ছিল শিল্পনগরী গাজীপুর। আজ (রোববার, ১ নভেম্বর) সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত টানা ছয় ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।

এ সময় শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একটি পুলিশ বক্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি ও একটি ঝুট গুদামে আগুনে দেয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি কারখানার ফটক ও একটি ব্যাংক।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্ধশত কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় বিকেল ৩টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে কাজে যোগ না দিয়ে কোনাবাড়ী, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে নেমে আসেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আন্দোলনকারীর সংখ্যা।

একপর্যায়ে হাজারো শ্রমিক লাঠিসোঁটা ও লোহার পাইপ হাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। সড়কের ওপর মোটরসাইকেল ও কাঠের জিনিসপত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা।

একপর্যায়ে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্স ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। এ সময় কয়েকটি পোশাক কারখানার ফটক এবং যমুনা ব্যাংকের একটি স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুট গুদামে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ, শিল্প পুলিশ, জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে মাঠে নামেন পাঁচ প্লাটুন বিজিবি সদস্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিতে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে বেলা দুইটার দিকে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার শিল্পকারখানাগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে এসব এলাকার অন্তত অর্ধশত পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। ফলে অনেক শ্রমিক কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। অন্যদিকে মহাসড়ক অবরোধ থাকায় আটকে পড়ে দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকেরা।

শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও হামলার শিকার হন কয়েকজন সংবাদকর্মী। চন্দ্রার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় দীপ্ত টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম ও এনটিভির মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আবু সাঈদকে মারধর এবং তাদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে পড়েন অন্য সংবাদকর্মীরাও।

তবে কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন আন্দোলনরত শ্রমিকেরা। তাদের দাবি, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলেন। বহিরাগত ব্যক্তিরা শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে এসব ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে।

আন্দোলনরত কয়েকজন শ্রমিক বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। রান্নার গ্যাসের একটি সিলিন্ডার কিনতেই তাঁদের প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, শুধু মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না, শ্রমিকদের নতুন বেতন কত নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই ঘোষণা দিতে হবে। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানান তারা।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাসুদুর রহমান রুবেল বলেন, সকাল থেকেই তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন। বিজিবি, এসআরবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ দুপুরের পর শ্রমিকেরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, গত কয়েক দিন ধরেই শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। রোববারও আন্দোলনের কারণে ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, এসআরবি, জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশ একযোগে কাজ করেছে। বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

এএইচ