যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) গতকাল (সোমবার, ২ নভেম্বর) এর আনুষ্ঠানিক সংবাদ ব্রিফিং, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) অডিও রেকর্ড এবং রাডার ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার একটি সামগ্রিক চিত্র সামনে এসেছে।
ককপিটের শেষ মুহূর্ত ও বৈমানিকদের সতর্কবার্তা
লাইভএটিসি ও ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের অস্টিন থেকে বাহামাগামী চার্টার বিমানটি ফ্লোরিডার নেপলসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে প্রথম সমস্যার মুখে পড়ে। ওই সময় বাইরে তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ককপিট থেকে মায়ামি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানানো হয়, তারা মাঝারি ঝাঁকুনির মধ্যে পড়েছেন এবং উড়োজাহাজে হালকা ও স্বচ্ছ বরফ (ক্লিয়ার আইস) জমছে।
এই বরফ জমার পরিস্থিতি এড়িয়ে মসৃণ উড্ডয়নের জন্য বৈমানিকরা ৩৫ হাজার থেকে ৩৭ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার অনুমতি চান। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল অনুমতি দেয়ার পরপরই ঘটে বিপর্যয়। ১২টা ৪৮ মিনিটে হঠাৎ করেই উড়োজাহাজটি খাড়াভাবে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। ক্রুরা দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে জানান, তারা নির্ধারিত গতির চেয়ে অনেক বেশি দ্রুততায় প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট নিচে নেমে যাচ্ছেন। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই জানানো হয়, পতনের গতি বেড়ে প্রতি মিনিটে ২২ হাজার ফুটে পৌঁছেছে এবং উড়োজাহাজটি ৬০ ডিগ্রি কোণে কাত হয়ে গেছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে এটি প্রতি মিনিটে ৩২ হাজার ফুটেরও বেশি গতিতে মাটির দিকে ধেয়ে আসছিল।
ডানায় বরফের ভার ও লিফট হারানোর ঝুঁকি
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম ঠান্ডার মধ্যে মেঘ বা বৃষ্টির সংস্পর্শে এলে উড়োজাহাজের পাখায় ‘ক্লিয়ার আইস’ জমতে পারে। এই বরফ সাধারণত অত্যন্ত ভারী ও শক্ত হয়ে ডানার মসৃণ নকশাকে বিকৃত করে দেয়। এর ফলে উড়োজাহাজের বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা (লিফট) মারাত্মকভাবে নষ্ট হয় এবং বাতাসের বাধা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, বরফ জমার কারণে উড়োজাহাজটি বাতাসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর স্টল (অ্যারোডাইনামিক স্টল)-এ পড়েছিল কি না। এছাড়া প্রতিকূল এই আবহাওয়ার রুটে বিমানটিকে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে এটিসির কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মাঝআকাশেই ভাঙনের আলামত ও ভিডিও ফুটেজ
এনটিএসবি সদস্য টম চ্যাপম্যান জানিয়েছেন, মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই উড়োজাহাজের কিছু অংশ মাঝআকাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট আলামত মিলেছে। গাড়ির ড্যাশক্যামে ধারণ করা পতনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাটিতে আঘাতের ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটির পেছনের আনুভূমিক স্ট্যাবিলাইজার (হরাইজন্টাল স্ট্যাবিলাইজার) কাঠামোর সঙ্গে ছিল না। স্ট্যাবিলাইজার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পাইলটের পক্ষে উড়োজাহাজের নাক ওপরে তোলা বা পতন রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণেই মূল দুর্ঘটনাস্থল ছাড়াও দূরবর্তী এলাকায় ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্তের জটিলতা ও ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ
পাম বিচের মিলিটারি ট্রেইল সড়কে উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ার পর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায় এবং সড়কে একটি বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। এনটিএসবি প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা টিমোথি মনভিল জানান, দুর্ঘটনার সময় এলাকায় তীব্র বৃষ্টিপাত চলায় সড়কের সেই গর্তটি পানিতে ভরে গেছে। ফলে মূল ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করাই তদন্তকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উড়োজাহাজটিতে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) ছিল কি না এবং তা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ড্রোন বিশেষজ্ঞ, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বারডিয়ারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত দল পুরো এলাকা পরীক্ষা করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে কোনো কারণ ঘোষণা না করে সব তথ্যপ্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানানো হবে।
—ইয়াহু নিউজ ও বিবিসির প্রতিবেদনে অবলম্বনে





