ইলিশের জেলা হয়েও স্বাদ বঞ্চিত ভোলার স্থানীয়রা, সংকটে জেলে পরিবার

নদীরপাড়
কৃষি , মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ
এখন জনপদে
0

চার কেজি গরুর মাংসের সমান টাকা খরচ করে মিলছে মাত্র এক কেজি ইলিশ। দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলিশ উৎপাদনকারী জেলা ভোলার মানুষ এখন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি। যে জেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী দেশের ইলিশের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত, সে জেলার সাধারণ মানুষের অনেকেই এখন ইলিশ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছেন। মৌসুমের শুরুতেই নদীতে দেখা দিয়েছে ইলিশের আকাল, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলে পরিবার, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ওপর।

প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে জেলেদের ব্যস্ততা শুরু হয় ইলিশ ধরাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এবার চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। অভয়াশ্রমে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা এবং সাগরে ৫৮ দিনের মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর নদী ও সাগরে নামলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা।

ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে শত শত মাছ ধরার নৌকা ছুটে চললেও জালে উঠছে না প্রত্যাশিত ইলিশ। কোথাও কোথাও অল্প কিছু ইলিশ মিললেও অধিকাংশ জেলে জালে ধরা পরছে পোয়া, ছোট পাঙ্গাশ কিংবা অন্যান্য মাছ। এতে জ্বালানি তেল, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিকের খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

ভোলার নদী পারের মাছ ঘাট ও আড়তগুলোতেও এখন আগের সেই কোলাহল নেই। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক আড়তদারও লোকসানের মুখে পড়েছেন।

ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলি মাছ ঘাটে কথা হয় জেলে, মফিজল মাঝি, রফিক মাঝি ও বশির মাঝিররা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় ঋণ করে সংসার চালিয়েছেন তারা। এখন মাছ না পেলে সেই ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ছে ঋণের চাপ।

আরও পড়ুন

নদীতে ইলিশের সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম বেড়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের ইলিশও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

কথা হয় মেঘনার পারের তুলাতুলি ঘাটে মাছ কিনতে আশা আদিল হোসেন তপু, অংকুর রায় ও খোকন দেবনাথের সঙ্গে তারা অভিযোগ করে জানান, ইলিশের জেলা হিসেবে পরিচিত ভোলায় বসবাস করেও এখন ইলিশ কেনা অনেকের জন্য স্বপ্নের মতো। পরিবারের সদস্যদের জন্য এক কেজি ইলিশ কিনতে যে টাকা প্রয়োজন, তা দিয়ে চার কেজির বেশি গরুর মাংস কেনা সম্ভব। ফলে অনেক পরিবার ইলিশের বাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কিনতে পারছে না।

এদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, নদীতে ডুবচরের সৃষ্টি, পানির প্রবাহে পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব পড়ছে। ফলে মাছের ঝাঁক এখনও নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রবেশ করেনি।’

ভোলা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন। তবে মৌসুমের শুরুতে এমন পরিস্থিতি দেখা দেয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ সরাসরি মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বিকল্প আয়ের কোনো উৎস নেই। ফলে নদীতে ইলিশের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জেলেদের নয়, পুরো উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পরবে।

জেআর