অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: অসৎ সঙ্গ ও কিশোর গ্যাংয়ের বলি?

চিরশায়িত অপ্রতিম
এখন জনপদে
অপরাধ
1

কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড নাড়া দিয়েছে গোটা সমাজকে। যাদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্ব, তাদেরই হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো এই কিশোরকে। আইফোন কেড়ে নিতেই তাকে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে ঘাতকরা। এ ঘটনা সামনে এনেছে- সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের কতটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার ১৩ বছরের ছেলে অপ্রতিমের ঘাতকরা তার পূর্ব পরিচিত। তার ফেসবুক ও টিকটকের ছবি দেখে বুঝা যায়, বয়সে বড় হলেও তাদের সঙ্গে অসম বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। মুখোশের আড়ালে এদের মাঝেই ছিল নিজের ঘাতক।

শুক্রবার দুপুরে বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি ৭ম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ে মেলে তার মরদেহ। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার সন্তানের এমন করুন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই। কেনো এমন ছোট শিশুকে হত্যার শিকার হতে হলো- তা নিয়ে আলোচনা সর্বত্র।

যে মা ঘরে ফিরলেই সন্তানের ঘ্রাণ খুঁজেন। যে ঘরের দেয়ালজুড়ে তার স্মৃতি। সেখানে আর ফিরবে না একমাত্র সন্তান-অপ্রতিম।

অপ্রতিমের পিতা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ওর যারা সিনিয়র ফ্রেন্ড, ওরা এর স্নেহটাকে মানে ওরে দিতে চাইছে, কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য ছিল অন্য যে ওর কাছ থেকে আমরা একটা কিছু নিয়ে নেবো।

অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা অবরোধ করে মহাসড়ক। তাদের প্রশ্ন- আমরা কি নিরাপদ? বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নির্জন এলাকাগুলোয় মাদকসেবীদের নিরাপদ অবস্থানে বাড়ছে ছিনতাই চুরি এবং ইভটিজিং- এমন অভিযোগও তাদের।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা জানান, কোটবাড়ী একটা নির্দিষ্ট জোন এলাকায়, এটা একটা গ্রাম সাইড হলেও এইখানেও যে পরিমাণ তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, হিসেবে অতি দ্রুত তার একটা সুরাহা করা প্রয়োজন। আন্দোলন করার কারণ এইটাই যে আমরা সবাই জোরদারভাবে জানাচ্ছি যে এটার একটা সুষ্ঠু বিচার আমরা চাই।

গত একদশকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে প্রাণ গেছে অন্তত ১৫জনের। অভিভাবকদের উদাসীনতা কিংবা তাদের পেশাগত ব্যস্ততায় নি:সঙ্গতা- সন্তানকে ঠেলে দিচ্ছে বিপথে- মত বিশ্লেষকদের।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মহিবুল হক বলেন,কিশোররা, যারা ১১ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়স বা ১৯ বছরের নিচে, যাদেরকে আমরা টিনএজার বলছি, তারা এটাতে কেন ঝুঁকে যাচ্ছে? এটার একটা বড় কারণ হচ্ছে, আমাদের আইনের মধ্যে কিন্তু টিনএজারদের ক্ষেত্রে আইনের ব্যাপারটা একরকম। কিশোরদের সংশোধনের ব্যাপারে সরকার যে ইতিবাচক চিন্তা থেকে করেছিল, এটাকে নিয়ে এখন ভাববার সময় আসছে।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, আমাদের আসলে এখন একান্নবর্তী পরিবার নেই। আমরা দিন দিনই একক পরিবারে পরিণত হয়েছি এবং এমন একক পরিবার যে সেখানে আসলে সমাজ কাঠামো বলতে আগের মতো কোনো শৃঙ্খলা নেই। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৮—এই বয়সের কিশোরদের ক্ষেত্রে। এবং সেই সময়ে যদি একটা শৃঙ্খলা ধরিয়ে দেয়া না যায়—এবং এটার বড় প্রশ্ন হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে থাকা, বাবা-মার সঙ্গ দেওয়া। এই সঙ্গ দেওয়াটা খুব জরুরি।

সন্তানদের সাথে দূরত্ব নয়, তারা কার সাথে মিশছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ হওয়ার আহ্বান পুলিশ সুপারের।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা আমাদের সন্তানদেরকে কার সাথে মিশতেছে—সহপাঠী বা বন্ধুর সাথে, নাকি সিনিয়রের সাথে, নাকি অন্য খারাপের সাথে? আমাদের যারা প্যারেন্টস—মানে বাবা-মা আছেন, তাদের কিন্তু উচিত আমাদের সন্তান কখন, কোথায়, কার সাথে যায় এবং কখন বাসায় ফিরে এবং কার সাথে মিশতেছে। এবং এই তথ্যগুলি যদি আমাদের সাথেও শেয়ার করে খারাপ সঙ্গে, তাহলে আমরা কিন্তু অবশ্যই এই বিষয়গুলি টেক কেয়ার করি।

সন্তানের জন্য শুধু ভালো খাবার আর পোশাক নিশ্চিত করলে হবে না। তার মনোদৈহিক বিকাশেও যত্নশীল হতে হবে অভিভাবকদের। স্কুলে বা ঘরের বাইরে প্রিয় সন্তান কার সঙ্গে মিশছে- সে দিকেও বাড়াতে হবে নজরদারি।

ইএ