দেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা ‘বন্ড সুকুক’!

ফাইল ছবি
অর্থনীতি
1

দেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে শরিয়াহভিত্তিক বন্ড। সরকারি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সংস্থানে যা এখন বেশ জনপ্রিয়। প্রতিবারই নিলামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আবেদন জমা পড়ছে। অর্থনীতিবিদরা একে প্রচলিত বন্ডের চমৎকার বিকল্প হিসেবে দেখলেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের অজ্ঞতায় সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। ফলে প্রশিক্ষণে গুরুত্ব বাড়াতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে পরিচিত বন্ড। যার মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ সংগ্রহ করে থাকে সরকার।

কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে যারা সুদমুক্ত বিনিয়োগে আগ্রহী, তাদের থেকে ঋণ নিতে পারে না সরকার। ফলে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে চালু করা হয় শরিয়াহভিত্তিক বন্ড সুকুক। যা দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশেও।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, ‘সুকুক হলো একটি ইসলামিক ধারার এক ধরনের বন্ড। এটা সারা পৃথিবীতে অনেকগুলো দেশে ইমপ্লিমেন্ট হয়েছে। যেমন- সৌদি আরব, মালয়েশিয়ায় এটা কাজ করেছে। মানুষ যাতে এ বিষয়ে সচেতন হয়, সেরকম কর্মসূচি এখানে চালু করতে হবে। এর জন্য আমি মনে করি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে।’

বাংলাদেশে সুকুকের যাত্রা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের জন্য প্রথমবার সুকুক ছাড়ে সরকার। পরবর্তীতে ২০২১ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন এবং ২০২২ সালে রেলওয়ের মেগা প্রকল্পের জন্য সুকুক ইস্যু করা হয়।

এরপর প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে সুকুক ইস্যু করে সরকার। সবশেষ চলতি বছরের মে মাসে ৮ম সুকুক ইস্যু করা হয়। যার মাধ্যমে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাড়া পায় সরকার।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সুকুকের মাধ্যমে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ হয়েছে। প্রতিটি নিলামেই জমা পড়ছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি আবেদন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি বন্ডের বিকল্প হিসেবে সরকারের ঘাটতি মেটানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। যার মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নির্ভরতা কমাতে পারে সরকার।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘সুকুক হচ্ছে বন্ড মার্কেটের একটা পার্ট। যেটাকে ইসলামিক বন্ড মার্কেট বলতে পারেন। সুকুক মার্কেট অল্প কিছু লাকের জন্য, যারা মার্কেট সম্পর্কে বোঝে, রিস্ক সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে—এই ব্যাপারগুলো আপনি সবার মধ্যে যদি দিতে পারেন, তাহলে সুকুক শুধু নয়, যেকোনো ইন্সট্রুমেন্ট এনে বাজারে ছাড়লে সেটা চলবে।’

অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরি বলেন, ‘এই বন্ডগুলোকে যদি সরকার আরও বেশি প্রচলিত করতে পারে, এগুলোকে যদি আরও বেশি জনপ্রিয় করতে পারে, তাহলে সরকারের একটা সুবিধা হবে যে, রাজস্ব আদায়ে যদি ঘাটতি আসে, সেটা এই বন্ড বিক্রির মাধ্যমে পুষিয়ে নিতে পারবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রতি সরকারের নির্ভরশীলতা কমে যাবে।’

বিনিয়োগের এমন উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুকুক সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন ব্যাংকাররা। ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ফিরে যাচ্ছেন। তবে সংকট কাটাতে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানালেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সুকুক প্রোডাক্টটি আমাদের দেশের ক্ষেত্রে নতুন আইটেম। আমাদের অনেক গ্রাহক এই বিষয় সম্পর্কে জানেন না, আবার ব্যাংকাররাও জানেন না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের একটি সীমিত সংখ্যক ব্যাংকাররদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে, যাতে তারা সুকুকের ট্রানজিশন সম্পর্কে ভালো ধারণা পায় এবং সেই ধারণাটা যাতে গ্রাহকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে জনগণ সুকুকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী হতে পারে।’

এই মাধ্যমকে জনপ্রিয় করতে হলে কেবল নিলামই যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এর সঠিক তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেয়া এখন সময়ের দাবি।

এসএইচ