তরুণ প্রজন্মের কেন দ্রুত ভাঙছে সংসার?

তরুণ-তরুণী
ফিচার
0

ছোট ছোট অবহেলা, অসম প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও যোগাযোগের ঘাটতিই কি বড় হয়ে উঠছে? সম্প্রতি এক তারকা দম্পতির বিচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ খুঁজছেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে, কেউ দায় দিচ্ছেন খ্যাতি ও ব্যস্ততাকে, আবার কেউ সরাসরি বলছেন ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা মানিয়ে নিতে জানে না।’

কিন্তু একটি দাম্পত্যের ভেতরের ব্যক্তিগত কারণ নিয়ে অনুমান করা যেমন অনুচিত, তেমনি একটি বিচ্ছেদকে পুরো প্রজন্মের চরিত্রের মাপকাঠি বানানোও ঠিক নয়। বরং এই ঘটনা সামনে এনেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, কেন বদলে যাচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্কের ধরন? কেন অনেক দম্পতি আগের তুলনায় দ্রুত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?

মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, সম্পর্ক ভাঙার পেছনে সব সময় বড় কোনো ঘটনা থাকে না। অনেক সময় দীর্ঘদিনের ছোট ছোট অবহেলা, যোগাযোগের ঘাটতি, অসম প্রত্যাশা এবং অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

দেশে কি সত্যিই বাড়ছে বিচ্ছেদ?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রতি হাজার জনে বিবাহবিচ্ছেদের হার ২০২১ সালে ছিল ০.৭। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১.৪-এ, এক বছরে দ্বিগুণ। তবে ২০২৩ সালে হার কিছুটা কমে ১.১-এ নেমে আসে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওঠানামা থাকলেও ২০২৩ সালের হার ২০২১ সালের চেয়ে বেশি।

আরও পড়ুন:

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, এই পরিসংখ্যান তরুণদের আলাদা করে নয়; এটি সামগ্রিক জনসংখ্যার বিবাহবিচ্ছেদের হার। তাই শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে ‘তরুণদের মধ্যে ডিভোর্স বেড়েছে’ এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

রাজধানীর চিত্রও আলোচনার দাবি রাখে। ২০২২ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৩ হাজার ২৮৮টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭ হাজার ৬৯৮টি এবং উত্তরে ৫ হাজার ৫৯০টি আবেদন ছিল। বছরে এই সংখ্যাকে দৈনিক হিসাবে ধরলে গড়ে প্রায় ৩৬টি আবেদন; অর্থাৎ প্রায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি আবেদন। তবে এগুলো আবেদন, চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হওয়া তালাকের সংখ্যা নয়।

তাহলে ভাঙছে কেন?

একটি সংসার সাধারণত একদিনে ভেঙে পড়ে না। বরং সম্পর্কের ভেতরে জমতে থাকা অসন্তোষ একসময় এমন জায়গায় পৌঁছায়, যখন দুজনের একজন বা দুজনই মনে করেন, এভাবে আর চলা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন:

দাম্পত্য-পরামর্শের ক্ষেত্রে প্রায়ই শোনা যায় এমন অভিযোগ ‘আমি কথা বলি, ও ফোনে ব্যস্ত থাকে’; ‘মেসেজ দেখে, কিন্তু উত্তর দেয় না’; ‘ঝগড়ার পর কয়েক দিন কথা বন্ধ থাকে’; ‘সংসারের সব দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়, অথচ সেটার কোনো স্বীকৃতি নেই।’

শুনতে ছোটখাটো সমস্যা মনে হলেও এগুলো দীর্ঘদিন চললে সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ভালোবাসার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘সাড়া দেয়া’

সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যানের কাজ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তার গবেষণায় দম্পতিদের মধ্যে ‘বিড’ বা সংযোগের ছোট ছোট আহ্বানের প্রতি সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

একজন সঙ্গী যখন বলেন, ‘আজ আকাশটা কী সুন্দর’, তখন সেটি নিছক একটি মন্তব্যও হতে পারে, আবার অপরজনের সঙ্গে একটি ছোট সংযোগ তৈরির চেষ্টাও হতে পারে। সঙ্গী সেটির দিকে মনোযোগ দিয়ে সাড়া দিতে পারেন, এড়িয়ে যেতে পারেন, কিংবা বিরক্তিও দেখাতে পারেন।

আরও পড়ুন:

গটম্যান ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত গবেষণা-সারাংশ অনুযায়ী, বিয়ের ছয় বছর পরও একসঙ্গে থাকা নবদম্পতিরা এমন সংযোগের আহ্বানে প্রায় ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সাড়া দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ছয় বছর পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দম্পতিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় বড় রোমান্টিক আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিদিনের ছোট ছোট মনোযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেমের সম্পর্ক আর সংসার এক জিনিস নয়

বিয়ের আগে দুজন মানুষ সাধারণত একে অপরের আনন্দের সময়টুকুই বেশি দেখেন। কিন্তু সংসারে এসে সামনে আসে জীবনের কঠিন বাস্তবতা; মাসের খরচ, চাকরির চাপ, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত, ঘরের কাজ এবং দুই পরিবারের প্রত্যাশা।

প্রেমের সময় যে বিষয়গুলো তুচ্ছ মনে হয়, বিয়ের পর সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে প্রতিদিনের বিরোধের কারণ।

আরও পড়ুন:

* কে সংসারের খরচ বহন করবেন?

* ঘরের কাজ কীভাবে ভাগ হবে?

* সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত কখন?

* কার ক্যারিয়ারকে কখন অগ্রাধিকার দেয়া হবে?

* দুই পরিবারের হস্তক্ষেপের সীমা কোথায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর বিয়ের আগে পরিষ্কার না থাকলে পরে একই বিষয় নিয়ে বারবার সংঘাত তৈরি হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বদলে দিচ্ছে প্রত্যাশা

আজকের দাম্পত্যে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে। অন্যের ভ্রমণ, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা সাজানো পারিবারিক ছবির সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত জীবনের বাছাই করা সুন্দর মুহূর্তই দেখায়; ক্লান্তি, ঋণের চাপ, ঝগড়া কিংবা হতাশা দেখায় না। ফলে নিজের স্বাভাবিক সংসারকেও কারও কারও কাছে ‘অসম্পূর্ণ’ মনে হতে পারে।

আরও পড়ুন:

অন্যদিকে, মোবাইল ফোনও অনেক সময় একই ঘরে থেকেও দুজন মানুষকে আলাদা করে রাখে। শারীরিকভাবে পাশাপাশি থাকা আর মানসিকভাবে পাশে থাকা, দুটি এক বিষয় নয়।

‘মানিয়ে নেয়া’ মানেই সব সহ্য করা নয়

তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত অভিযোগ ‘তারা মানিয়ে নিতে পারে না।’ কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সমঝোতা প্রয়োজন। তবে নির্যাতন, অপমান, সহিংসতা, প্রতারণা বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক নিপীড়ন সহ্য করাকেই ‘সংসার টিকিয়ে রাখা’ বলা যায় না।

বিশেষ করে নারীদের আর্থিক ও সামাজিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসুখী বা নির্যাতনমূলক সম্পর্কে থাকার বাধ্যবাধকতাও কিছুটা কমছে। ঢাকা শহরের ২০২২ সালের তালাক আবেদনের তথ্যেও দেখা যায়, নারীদের পক্ষ থেকে আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। ঢাকা দক্ষিণে ৭ হাজার ৬৯৮টি আবেদনের মধ্যে ৫ হাজার ৩৮৩টি করেছিলেন স্ত্রী; উত্তর সিটি করপোরেশনেও নারীদের আবেদনের হার ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ।

তাই বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়াকে সব সময় ‘পরিবার ভেঙে যাওয়ার লক্ষণ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কখনো বিচ্ছেদ একটি অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথও হতে পারে।

তবে সব বিচ্ছেদ কি অনিবার্য?

না।

কিছু সম্পর্ক ভাঙা প্রয়োজন হতে পারে, আবার কিছু সম্পর্ক হয়তো সময়মতো মনোযোগ, যোগাযোগ ও পেশাদার সহায়তা পেলে টিকে যেতে পারত।

দাম্পত্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হয়তো বড় ঝগড়া নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি, যখন একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনই অনুভব করেন না।

আরও পড়ুন:

‘তুমি কখনো আমাকে বোঝো না’ এর চেয়ে ভয়ংকর হতে পারে ‘তোমার সঙ্গে কথা বলেই লাভ নেই।’ কারণ প্রথম বাক্যে এখনো প্রত্যাশা আছে। দ্বিতীয় বাক্যে সেই প্রত্যাশাটুকুও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

সম্পর্ক বাঁচাতে কী করা যায়?

সমাধান সব সময় জটিল নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে শুরুটা হতে পারে খুব সাধারণ কিছু অভ্যাস দিয়ে। প্রথমত, প্রতিদিন কিছু সময় ফোন ও অন্য ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে শুধু দুজনের কথা বলা। দ্বিতীয়ত, ঝগড়ার সময় মানুষটিকে আক্রমণ না করে সমস্যাটিকে নিয়ে কথা বলা। ‘তুমি সব সময় এমন’ না বলে ‘তোমার এই আচরণে আমার খারাপ লেগেছে’, এভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা। তৃতীয়ত, বিয়ের আগেই অর্থ, সন্তান, ক্যারিয়ার, ঘরের দায়িত্ব এবং দুই পরিবারের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করা। চতুর্থত, সমস্যা দীর্ঘদিন জমতে না দেয়া। প্রয়োজন হলে দম্পতি-পরামর্শকের সহায়তা নেয়া।

কারণ শারীরিক অসুস্থতা হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। সম্পর্কের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চললেও পেশাদার সহায়তা নিতে অনেকের এখনো সংকোচ কাজ করে।

আরও পড়ুন:

সংসার টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় উপাদান কী?

সম্ভবত ‘সহ্য করার ক্ষমতা’ নয়; বরং একে অপরকে বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছা। একজন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে তার পাশে বসা। একজন কথা বলতে চাইলে ফোনটা নামিয়ে রাখা। ঝগড়ার পর প্রথমে কে কথা বলবে, সেই প্রতিযোগিতা না করা। সঙ্গীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি দেয়া। আর ভুল হলে ‘আমি ঠিক’ প্রমাণ করার বদলে সম্পর্কটাকে ঠিক করার চেষ্টা করা।

সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত কখনো কখনো প্রয়োজনীয়। কিন্তু যে সম্পর্কটি বাঁচানো সম্ভব, সেটিকে বাঁচাতে সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় দরকার হয় শুধু একটু মনোযোগ, একটু সম্মান, একটু সময় এবং কথা বলার সাহস। কারণ সংসার এক দিনে ভাঙে না। অনেক সময় ভাঙে সেইসব ছোট মুহূর্তে, যখন একজন বারবার হাত বাড়ায়, আর অন্যজন বারবার মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এসএস