ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দীর্ঘ ‘ক্ষয়যুদ্ধ’-এর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। মূলত ধীরে ধীরে শক্তি ক্ষয় করার যুদ্ধকে ক্ষয়যুদ্ধ বলা হয়।
সংঘাতে অচলাবস্থার ইঙ্গিত মিলছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে ইসরাইলের হামলা এবং ইসরাইল লক্ষ্য করে ইরান ও হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।
লেবাননে ইসরাইলি হামলায় ১০ দিনের কম সময়ে অন্তত ৬৩৪ জন নিহত ও ১ হাজার ৫৮৬ জন আহত হয়েছেন। দেশটির সরকারের কাছে ৮ লাখ ১৬ হাজার ৭০০-এর বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।
গতকাল (বুধবার, ১১ মার্চ) রাতে উত্তরের ইসরাইলে হিজবুল্লাহ ড্রোন ও রকেট নিক্ষেপের পর বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর ও দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে রকেট নিক্ষেপের ঘটনাটি যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম।
উপসাগরে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের আটটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, শাইবা তেলক্ষেত্রের দিকে আসা পাঁচটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিহত জ্যেষ্ঠ ইরানি কমান্ডারদের জানাজায় বিপুল জনসমাগম হয়। শোকাহতরা কফিন বহন করেন এবং নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতিকৃতি প্রদর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল অভিযানের প্রথম মিনিটেই তারা নিহত হন বলে জানানো হয়।
গতকাল (বুধবার, ১১ মার্চ) প্রথমবারের মতো ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, নতুন নেতা বিমান হামলায় আহত হয়েছেন। হামলায় তার বাবা, মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিহত হন। ৫৬ বছর বয়সী এই নেতা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জনসমক্ষে আসেননি। সাইপ্রাসে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা সালারিয়ান বলেন, তিনি পা ও হাতে আহত হয়েছেন এবং হাসপাতালে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আপাতত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন, ‘সব লক্ষ্য অর্জন ও অভিযান জয়ের আগ পর্যন্ত সময়সীমা ছাড়াই’ অভিযান চলবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছেন। কখনো যুদ্ধকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ বলেছেন, আবার বলেছেন ‘আমরা যথেষ্ট পরিমানে জিততে পারিনি।’ গতকাল (বুধবার, ১১ মার্চ) কেন্টাকির হেব্রনে তিনি বলেন, ‘আমরা জিতেছি, তবে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র লড়াই চালিয়ে যাবে।’ তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ৫৮টি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে।
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিজনিত অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সুপারিশ করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়।
তবে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালিতে এখনো নিরাপদ নৌচলাচলের লক্ষণ নেই। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল (বুধবার, ১১ মার্চ) উপসাগরে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ১৪টি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলবাহী জাহাজ “খুব দ্রুতই নিরাপদ চলাচল” করতে পারবে।’
ইরানের দক্ষিণ উপকূলঘেঁষা এ সরু নৌপথে হামলার আশঙ্কায় শত শত জাহাজ আটকে রয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বোমাবর্ষণ বন্ধ না করা পর্যন্ত “এক ফোঁটা তেলও” এ পথ দিয়ে যেতে দেয়া হবে না।’
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলক্ষেত্র ও শোধনাগারেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের সামরিক মুখপাত্র এব্রাহিম জোলফাকারি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করেছেন আপনারা—তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে প্রস্তুত থাকুন।’
গতকাল (বুধবার, ১১ মার্চ) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস করে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি প্রস্তাবটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানান।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সদরদপ্তর, হাইফার নৌঘাঁটি ও একটি রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তারা কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বলছে, তাদের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা শেষ করা। একই সঙ্গে তারা ইরানের জনগণকে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠতে উৎসাহিত করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, সাতজন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ১৪০ জন আহত হয়েছেন।





