ইরান অবরোধ পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান
বিদেশে এখন
2

সৌদি আরব মরুভূমি পেরিয়ে লোহিত সাগরে পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পাঠিয়ে নিজের রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও এসময়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বহাল ছিল। তবে লোহিত সাগরের প্রস্থানপথও বন্ধ হয়ে গেলে ওই সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন রয়েছে রিয়াদ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদকদের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলে আসা অবস্থানকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধ ভেঙে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরব এখন নাকি আশঙ্কা করছে, ইরানের বন্দর অবরোধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রিয়াদ ট্রাম্প প্রশাসনকে ‘হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নিতে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরতে’ চাপ দিচ্ছে। আরব কর্মকর্তারা মার্কিন ওই প্রকাশনাকে বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলো বন্ধের ট্রাম্পের পদক্ষেপ তেহরানকে পাল্টা জবাব দিতে এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যাহত করতে উসকে দিতে পারে বলে সৌদি আরব আশঙ্কা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের সব ধরনের রপ্তানি ও আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত ইরানি অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো। তবে সৌদি আরব নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, ইরান প্রতিশোধ হিসেবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। লোহিত সাগরের এই সংকীর্ণ নৌপথটি সৌদি আরবের বাকি তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসাগরজুড়ে উদ্বেগ

ছয় সপ্তাহের যুদ্ধজুড়ে তেহরান দেখিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা দুটিই তাদের আছে, পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানোর ক্ষমতাও আছে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোর ঝুঁকির হিসাব বদলে গেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তেল ও গ্যাস পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়েছে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিঘ্নের পর সৌদি আরব মরুভূমি পেরিয়ে লোহিত সাগরে তেল পাঠিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি, যা যুদ্ধের আগের মাত্রা, ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, লোহিত সাগরের ওই প্রস্থানপথও বন্ধ হয়ে গেলে এই সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে বলে রিয়াদ আশঙ্কা করছে।

বাব আল-মান্দেবের কাছের দীর্ঘ উপকূলরেখা ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথিদের নিয়ন্ত্রণে। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ হুথিরা গাজা উপত্যকার যুদ্ধজুড়ে এই জলপথে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। এখন ইরান আবারও ওই সংকীর্ণ পথ বন্ধ করতে দলটিকে চাপ দিচ্ছে বলে আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ওয়াশিংটনের নীতিবিষয়ক সংস্থা নিউ আমেরিকার ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন বলেছেন, ‘ইরান যদি বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে চায়, তা করতে হুথিরাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অংশীদার। গাজা সংঘাতের জবাবে তারা তা করার সক্ষমতা রাখে, তা তারা দেখিয়েছেও।’

বাব আল-মান্দেব নিয়ে ইরানের সতর্কতা

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের ঘনিষ্ঠ আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ লোহিত সাগরের এই প্রবেশদ্বার বন্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা আলি আকবর ভেলায়েতি গত ৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘তেহরান বাব আল-মান্দেবকে হরমুজের মতোই দেখে। হোয়াইট হাউস যদি আবারও তার বোকামি পুনরাবৃত্তি করার কথা ভাবে, তবে দ্রুতই বুঝতে পারবে—একটি ইঙ্গিতেই বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ ব্যাহত করা যায়।’

এদিকে সোমবার ইরান যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নৌপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপরও হুমকি আসতে পারে বলে সতর্ক করে।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরআইবি নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, ‘পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।’

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট

এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখন সৌদি আরবের পাল্টা অবস্থানও দেখিয়ে দিচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা কতটা। শান্তিকালে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের কারণে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে, আর ফিউচারস দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধ গত সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউস বলেছে, এ পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা আছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি চান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা থাকুক, যাতে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হয়, প্রশাসন আমাদের উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে, যাদের সহায়তা করছেন প্রেসিডেন্ট, যাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশকে চাঁদাবাজি করতে না পারে।’

উপসাগরের ইরান-সমস্যা

ছয় সপ্তাহের এই যুদ্ধ ইরান ও তার প্রধান আঞ্চলিক প্রতিবেশী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও ইরাকের মধ্যে গভীর উত্তেজনাও প্রকাশ করে দিয়েছে। তারা এত দিন অনানুষ্ঠানিক এক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যায়নি, কারণ যুদ্ধ হলে সবার অর্থনৈতিক স্বার্থই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এখন ভেঙে গেছে।

এখন উপসাগরীয় দেশগুলো নাকি এমন যুদ্ধের পরিসমাপ্তি চায় না, যাতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থেকে যায়—এই প্রণালিই তাদের অর্থনীতির জীবনরেখা। তবে সৌদি আরবসহ অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রকে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে মীমাংসা করতে চাপ দিচ্ছে এবং আলোচনা আবার শুরু করার জন্য তড়িঘড়ি করছে।

এএম