তাইওয়ান-চীন সংকট: সার্বভৌমত্ব নাকি ঐতিহাসিক দাবি?

তাইওয়ান-চীন সংকট
বিদেশে এখন
0

ঠিক কি কারণে তাইওয়ান-চীনের দ্বন্দ্ব? দ্বীপটি কি সত্যি চীনের নাকি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র তাইওয়ান? এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। এমনকি তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঠেকানোর জন্য চীনের আসলেই আইনি ভিত্তি রয়েছে কি-না; তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এছাড়া নিজেদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ঘোষণায় তাইওয়ানে বাধা কোথায়; নাকি আগে থেকেই দ্বীপটি স্বাধীন?

চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন তাইওয়ান মূলত দক্ষিণ চীন সাগরের একটি দ্বীপ। এটি কি চীনের অংশ; নাকি স্বাধীন কোন দেশ? এ নিয়ে প্রশ্ন-বিতর্ক বহু বছরের। কারণ দ্বীপটি নিজেদের বলে পাল্টা-পাল্টি দাবি করে আসছে তাইপে-বেইজিং। এমনকি তাইওয়ান মিত্র হওয়াকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বৈরিতার ইতিহাসও দীর্ঘ।

১৪মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফর ঘিরে আলোচনায় তাইওয়ান প্রসঙ্গ। যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচ্যসূচিতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানের স্বাধীনতা প্রসঙ্গটি গুরুত্ব দেবেন বলে ইঙ্গিত মিলছে। এ অবস্থায় তাইওয়ানের স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায় এবং তাইওয়ান ইতোমধ্যেই স্বাধীন কি-না; তা বুঝতে হলে ঢুকতে হবে ইতিহাসের গভীরে।

ইতিহাস বলছে, তাইওয়ান দ্বীপটি পূর্বে ফরমোসা নামে পরিচিত ছিলো। ১৬শ'র দশকে ডাচ এবং স্প্যানিশরা খুব কম সময়ের জন্য শাসন করার আগে পর্যন্ত সেখানে বসবাস করতেন হাজার হাজার বছর ধরে আদিবাসী। আর চীনের শেষ সাম্রাজ্যবাদী রাজবংশ চিং ১৬৮৪ সালে তাইওয়ানকে ফুজিয়ান প্রদেশের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো। পরে ১৮৮৫ সালে এটিকে একটি পৃথক চীনা প্রদেশ হয়। এরপর জাপানের সাথে যুদ্ধে চিং রাজবংশের পরাজয়ের পর ১৮৯৫ সালে এটি জাপানি উপনিবেশে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন:

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ফের এর শাসনভার ফিরে পায় চীন সরকার। এরপর আবার চীনে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টদের কাছে পরাজিত হয়ে কুওমিনতাং সরকার তাইওয়ানে সরে যায়। সেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে এবং দ্বীপটিকে তাইওয়ান হিসেবেও অভিহিত করে। কিন্তু তাইওয়ানসহ সমগ্র চীনের বৈধ সরকার হিসেবে দাবি করে তৎকালীন চীনের মাও জেদং সরকার।

এরপর কৌশলগত কারণে ১৯৭৯ সালে তাইপের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দ্বীপটিকে আত্মরক্ষায় অস্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহে আইনত বাধ্য ওয়াশিংটন। এমনকি তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক মর্যাদা'র প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়- কাগজে কলমে অনানুষ্ঠানিক হলেও; ওয়াশিংটন-তাইপের কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অনেক শক্ত। তবে তাইওয়ানের নাগরিকরা তাদের নিজস্ব পাসপোর্ট ব্যবহার করে অনেক দেশেই অবাধে ভ্রমণ করতে পারেন। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক বজায় রেখেছে বেলিজ এবং টুভালুর মতো পশ্চিমা ১২টি দেশ।

কার্যত স্বাধীনতা ভোগ করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশই তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের নেতা নির্বাচিত করা, আলাদা পাসপোর্ট ও মুদ্রা সহ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ তাইওয়ান কর্তৃপক্ষের হাতেই। তবে তাইওয়ান প্রজাতন্ত্র ঘোষণা নিয়ে রয়েছে জটিলতা। কারণ এর জন্য সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য সংসদীয় অনুমোদন এবং তারপর একটি গণভোটের প্রয়োজন হবে। ২০১৬ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল-ডিপিপি সংবিধান পরিবর্তনের কোনো চেষ্টাও করেনি। তবে চীন থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে আসছেন এবং তাইওয়ানের শাসকরা।

তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঠেকানোর জন্য চীনের আইনি ভিত্তি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তবে ২০০৫ সালে নামমাত্র সংসদ বিচ্ছিন্নতাবিরোধী আইন পাস করেছে চীন। যা তাইওয়ান বিচ্ছিন্ন হলে বা শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ হয়ে গেলে বেইজিংকে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার আইনি ভিত্তি দেয়। কিন্তু আইনটি অস্পষ্ট এবং এতে কোনো বিস্তারিত বিবরণ নেই।

ইএ