হরমুজ প্রণালিতে দ্বীপ পাহারা ও চেকপোস্ট; পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে

হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী ট্যাংকার
বিদেশে এখন
0

যুদ্ধকালীন জ্বালানি সংকট সামাল দিতে দেশগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে একটি বহুমুখী ব্যবস্থা বা ‘মাল্টি-টিয়ার্ড সিস্টেম’ কার্যকর করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থার সঙ্গে আপস না করার বিষয়ে সতর্ক করলেও কিছু জাহাজ ও দেশ ঝুঁকি নিয়েই তেহরানের শর্ত মেনে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই জলপথে এখন চেকপোস্ট বসিয়ে, কড়া নজরদারি চালিয়ে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ‘ফি’ আদায় করে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত মে মাসে ‘আজিওস ফ্যানোরিওস ১’ নামের একটি বিশাল ট্যাংকারের যাত্রা এই নতুন ব্যবস্থার একটি বাস্তব উদাহরণ। ইরাকি অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভিয়েতনামের উদ্দেশে রওনা হওয়া ৩৩০ মিটার দীর্ঘ এই ট্যাংকারটি এপ্রিলে দুবাই উপকূলে আটকা পড়েছিল। পরে ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে এটি হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করে।

তবে প্রণালি পার হওয়ার সময় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের স্পিডবোট এটিকে থামিয়ে দেয়। চোরাচালানের সন্দেহে তল্লাশি শেষে ৫ ঘণ্টার পথ দুই দিন পর পাড়ি দিতে সক্ষম হয় ট্যাংকারটি। যদিও জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কোনো অর্থ দিতে হয়নি এবং ইরাক ও ভিয়েতনামের চাপের কারণেই ইরান এটিকে পার হতে দিয়েছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালির এই নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে আইআরজিসি। তাদের এই ব্যবস্থায় মিত্র দেশ যেমন রাশিয়া ও চীনের জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরপর ভারত ও পাকিস্তানের মতো ঘনিষ্ঠ দেশের জাহাজগুলো সুযোগ পাচ্ছে।

আর বাকি জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় শিপিং সূত্র জানিয়েছে, যেসব জাহাজের এমন কোনো চুক্তি নেই, তাদের অনেককে নিরাপদ পারাপারের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে দেড় লাখ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে। তবে কতগুলো জাহাজ এভাবে ফি দিয়ে পার হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জিটুজি চুক্তির বাইরে থাকা জাহাজগুলোকে পারাপারের অনুমতি পেতে আইআরজিসির কড়া নজরদারির (ভেটিং) মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। জাহাজ মালিকদের ‘অ্যাফিলিয়েশন ডকুমেন্ট’ জমা দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের কোনো সম্পর্ক নেই।

এই যাচাই-বাছাইয়ে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং প্রয়োজনে আইআরজিসি জাহাজ পরিদর্শনও করে। এই প্রক্রিয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্মকর্তারাও যুক্ত থাকেন। ভারতের মতো দেশগুলো তাদের তেহরান দূতাবাসের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে এবং আইআরজিসির দেয়া সুনির্দিষ্ট রুট মেনেই জাহাজ পার করছে।

হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজগুলোর স্বস্তি এখানেই শেষ নয়। আজিওস ফ্যানোরিওসের মতো জাহাজ ইরানি জলসীমা পেরোতেই ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের মুখে পড়ে।

মার্কিন কমান্ডের একজন মুখপাত্র জানান, অবরোধ কার্যকরের অংশ হিসেবে তারা এই জাহাজটিকে আটকে রেখেছিলেন। তবে টানা ছয় দিন আটকে থাকার পর ভিয়েতনামের চাপে মার্কিন নৌবাহিনী কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই জাহাজটিকে ছেড়ে দেয়। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন বিশ্ববাণিজ্যের জন্য এক চরম অনিশ্চিত ও ভীতিকর জলপথে পরিণত হয়েছে।

এএম