যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প; নতি স্বীকারে নারাজ ইরান—বিবিসির বিশ্লেষণ

তেহরানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিছবি সহ একটি বিলবোর্ড
বিদেশে এখন
0

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও সরাসরি যুদ্ধে ফিরে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন সামরিক উস্কানিও থেমে নেই। বিবিসির বিশেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের নাগালে তাদের শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে। অন্যদিকে এটি নিশ্চিত যে, ইরানি শাসকরা তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতির এই সময়টাকে তারা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে ব্যবহার করছে।

উপসাগরীয় এলাকায় এই সশস্ত্র উত্তেজনা দুই পক্ষকেই ভুল হিসাব বা ভুল উপলব্ধির ঝুঁকিতে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে চাপে রাখতে চায় এটি বুঝিয়ে যে, তারা কাছাকাছিই আছে এবং বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম। বিপরীতে ইরান মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের প্রতিরোধের সংকল্পে কোনো চির ধরেনি। প্রয়োজনে তারা আবারও মার্কিন ঘাঁটি এবং আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে হামলা চালাবে।

একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করা। কিন্তু বৈরুতে আবারও বোমা হামলার বিষয়ে ইসরাইলের ঘোষণা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে খুব একটা আগ্রহী নন। তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো চুক্তি মানেই তা একটি ‘খারাপ চুক্তি’।

অন্যদিকে ইরান তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো বড় চুক্তির শর্ত হিসেবে লেবাননে ইসরাইলি অভিযান বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প আপাতত ইসরাইলকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিনিময়েও ইরান বড় কোনো মূল্য দাবি করবে। সেটি হতে পারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পথে কিছু তেল পাঠাতে পারলেও বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এখনও বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয়।

ট্রাম্প এখন এক বড় ফাঁদে পড়েছেন। খুব সহজে জয়ী হওয়ার ভুল ধারণা নিয়ে তিনি যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। তিনি এবং তার মিত্র নেতানিয়াহু মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন যে, ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রেও দারুণ অজনপ্রিয়।

ট্রাম্পের মূল সমস্যা হলো, ইরান যেসব ছাড় দাবি করছে, তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থিরা তার ঘোর বিরোধী। আবার ট্রাম্প নিজেও চান না যে তার চুক্তিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে কেউ তুলনা করুক।

ইরানি শাসকরা মনে করেন, তারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের হামলা তাদের এই অবস্থান থেকে টলাতে পারবে না। অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও চায় না এই যুদ্ধ আর চলুক। তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ এই যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তখন তারা দুজনেই বলেছিলেন যে তাদের বিমান শক্তিই তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট হবে। তারা ভুল ছিলেন। তারা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে টিকে থাকা একটি শাসনব্যবস্থার লড়াই করার ক্ষমতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ সারা বিশ্বকে সেই ভুলের পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে।

এএম