পুতিনের নামে পাঠানো চিঠি, তবে জেলেনস্কির লক্ষ্য ছিল অন্যরা

ভলোদিমির জেলেনস্কি
বিদেশে এখন
0

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়ে যে খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভলোদিমির জেলেনস্কি, তার আসল লক্ষ্য ছিলেন আসলে অন্যরা। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিনিয়োগ ফোরাম এবং তার বাইরের প্রভাবশালী মহলেই বার্তাটি পৌঁছে দেয়াই ছিল ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের মূল উদ্দেশ্য। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পুতিন যখন রাশিয়ার শীর্ষ এই বাণিজ্যিক আয়োজনে বিদেশি সংবাদ সম্পাদকদের সঙ্গে ব্রিফ করছিলেন, ঠিক তার আগমুহূর্তে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চিঠিটি প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। এর আগের দিনই ইউক্রেনীয় ড্রোন সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি তেল টার্মিনালে আঘাত হেনেছিল। ফোরামের ভেন্যুর কাছেই আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গিয়েছিল।

চিঠির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তার ভাষ্য, ইউক্রেন বিশ্বাস করে রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির একটি অংশ—বিশেষ করে ‘কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং রাশিয়ার অংশীদারেরা’—এই সংঘাতের অবসান চান। কারণ এই যুদ্ধ রাশিয়ার ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে।

এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে বিরাজমান বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনেছে। কেউ কেউ বলছেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বের জন্য প্রস্তুত হয়ে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ যুদ্ধ অবসানের অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়টি বেশি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছেন।

কয়েক মাস ধরেই যুদ্ধবিরতি ও পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানিয়ে আসছেন জেলেনস্কি। তবে প্রতিবারই পুতিন তা নাকচ করে দিয়েছেন। শুক্রবারও তিনি একই কাজ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জেলেনস্কি আন্তরিকভাবেই আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছেন। তবে কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকসের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ দিমিত্রি ইয়ারোভি বলেছেন, ড্রোন হামলা এবং ‘পারফরমেটিভ’ চিঠি—দুটিই ফোরামের আলোচনার ধারাকে প্রভাবিত করার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল।

তার ভাষ্য, এই চিঠির মাধ্যমে রুশ সমাজ এবং পশ্চিমা সরকারগুলোকে—বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে—এই বার্তা দেয়া হয়েছে যে, সাম্প্রতিক ভূখণ্ডগত অগ্রগতি এবং রাশিয়ার ভেতরে চালানো দূরপাল্লার হামলা কিয়েভকে আলোচনার টেবিলে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় ন্যাটোতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ইউক্রেনবিষয়ক দূত কার্ট ভলকার বলেন, ‘ট্রাম্প সব সময় বলেন, ইউক্রেনের হাতে কোনো তাস নেই। অথচ ইউক্রেন এখন দেখাচ্ছে যে তারা একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কয়েক মাসের শান্তি আলোচনা এখন অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে।

পুতিন বিদেশি সম্পাদকদের জানিয়েছেন, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলোচনায় যুদ্ধ অবসানের শর্তগুলোর রূপরেখা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। মূলত ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শিল্প-হৃদয় ও সামরিক ঘাঁটি দনবাসের অবশিষ্ট অংশ ছেড়ে দেয়ার দাবিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

তবে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে নেয়ার প্রশ্নে জেলেনস্কিকে আগের চেয়েও কঠোর মনে হচ্ছে। চিঠিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে স্পষ্ট করে বলেছেন, ইউক্রেনের ভাগ্য ‘অ্যাঙ্কোরেজে নির্ধারিত হবে না’, বরং তা নির্ধারণ করবে ইউক্রেন ও রাশিয়া। তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এখন আর গোটা দনবাস দখলের আশা রাশিয়ার করা উচিত নয়।

এএম