দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা; বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি তেহরানের

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের হামলার পর ইরানের অজ্ঞাত স্থান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে
বিদেশে এখন
0

ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে বোমাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, মঙ্গলবার শুরু হওয়া হামলায় ‘সুনির্দিষ্ট গোলাবারুদ দিয়ে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত হানা হয়েছে। প্রায় চার ঘণ্টা পর এই অভিযান শেষ হয়। এর পাল্টা জবাবে ‘চূর্ণকারী প্রতিক্রিয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইরানি সামরিক নেতারা। তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় বিদেশি হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরে জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে ৮৫টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর নগরী সিরিকে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার ঘাটগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাসের আশপাশের এলাকায়ও হামলা হয়েছে। কিছু সময় পর কুয়েত ও বাহরাইনেও সাইরেন বাজানো হয়। কুয়েতি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘বৈরী’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিকের বাণিজ্যিক ঘাটে ছররা লেগে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনকে ভূপাতিত করেছে।

তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় টিভির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির আশপাশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কেশমে ছয়টি বিস্ফোরণ শোনা গেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে এই দ্বীপের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক।’ তিনি জানান, সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত সাতটি বিস্ফোরণ শোনা গেছে। আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদক রেসুল সরদার তেহরান থেকে জানান, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরানের সামরিক স্থাপনায় এটিই ‘যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হামলা’।

ইরানের সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরাক সফরে থাকা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হামলার পর দেশে ফিরে এসেছেন।

বিস্ফোরণের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার দায়ী থাকবে। এই এমওইউতে ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার শর্ত ছিল।

গত জুন মাসের শেষে ৬০ দিনের জন্য ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করতেও সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এমওইউ সইয়ের ২০ দিন না পেরোতেই মঙ্গলবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সেই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। জুনে ঘোষিত ওই লাইসেন্স ইরানকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও এ সংক্রান্ত পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের অনুমতি দিয়েছিল।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তেল নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এমওইউর বড় লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘দক্ষিণ ইরানে হামলাকেও’ চুক্তির আরও বড় লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ট্রেজারি বিভাগের এই সিদ্ধান্ত হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলার পর এসেছে। ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সোমবার হরমুজ প্রণালিতে ‘অজ্ঞাত গোলার’ আঘাতে ওমান উপকূলে একটি কাতারি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। ইরানি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় ওই এলএনজি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। তবে তেহরান সরাসরি হামলার দায় স্বীকার করেনি। সেন্টকম বা আইআরজিসি কেউই এই ঘটনায় মন্তব্য করেনি।

সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আইআরজিসির ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রে সৌদি পতাকাবাহী অপরিশোধিত তেলের আরেকটি ট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এসব হামলা ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং এর জবাব দেয়া হবে।

হোয়াইট হাউস থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না জুনের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমরা আগেও এই পরিস্থিতিতে ছিলাম।’ তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে ইরান একটি উত্তরের নৌপথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে, যা ইরানের কাছাকাছি এবং কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে তাদের নৌবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত দক্ষিণ পথ ব্যবহারের আহ্বান জানাচ্ছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাব দিতে ইরান প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘এসব হুমকি ইরানি জাতির প্রস্তুতি ও সংহতি আরও বাড়িয়ে দেবে। যেকোনো নতুন আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ইরান নিজেকে রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা তারা নেবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ‘ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা মওকুফের ছাড় প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ১০ নম্বর ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। আর ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী সামরিক অভিযান একই সমঝোতা স্মারকের ১ ও ২ নম্বর ধারার গুরুতর লঙ্ঘন।’ তিনি লেবাননে ইসরাইলি হামলা ও ইরানের বিরুদ্ধে হুমকিমূলক বক্তব্যের উদাহরণ টেনে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার এমওইউ লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করেছেন।

এএম