এক মাস আগে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার পর ট্রাম্প এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। তিনি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে এবং তেহরানকে নিজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে চাইছেন।
যদিও দুই পক্ষ এখনো পর্যন্ত সর্বাত্মক সংঘাতে ফিরে যাওয়া এড়াতে পেরেছে, তবে এই সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার আশা ম্লান হয়ে গেছে। এই সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়েছে এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার টানা ষষ্ঠ দিনের মতো পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। এদিকে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তবে দেশটি ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের দিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল-নৌপথ—লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
ক্রমবর্ধমান হতাশার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প তার সহকারীদের সঙ্গে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়ানো নিয়ে কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি স্থাপনা ও সেতু, ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলে স্থল বাহিনী পাঠানো এবং ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ একটি পরমাণু-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় বোমাবর্ষণের বিষয়টি।
উচ্চ ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় এই বিকল্পগুলোর কিছু অবাস্তব হতে পারে। তিনি এর আগেও এই ধরনের হুমকি দিয়ে পিছু হটেছেন।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই একমত যে, ইরানের শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিপজ্জনক ও রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য স্থল আক্রমণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় ধরনের হামলাই ইরানকে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করার ক্ষেত্রে আগের পর্যায়গুলোর চেয়ে বেশি কার্যকর হবে না। সাড়ে চার মাসের এই যুদ্ধের আগের ধাপগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হয়েছেন এবং সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক উপকর্মকর্তা ও বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত জোনাথান পানিকফ বলেন, ‘বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, এই সাম্প্রতিক হামলা কিংবা প্রেসিডেন্ট যা-ই ভাবছেন, তা ইরানিদের চিন্তাধারা বদলাতে বাধ্য করবে। বরং এতে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট কূটনীতিকেই পছন্দ করেন। তবে তার ভাষায়, ‘ইরান শুধু একটি ভাষাই বোঝে—সেটি হলো সামরিক শক্তি।’ প্রণালিতে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে বলেও তিনি জানান।
অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে পড়ছে
হাজার হাজার প্রাণহানির ঘটনা ঘটে যাওয়া এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। এই যুদ্ধে মূলত ইরান ও লেবাননের মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধ দেশে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ তৈরি করেছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। এমন সময়ই এই অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে পড়ল।
অন্তর্বর্তী এই চুক্তিকে স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দেয়ার আলোচনা থেমে গেছে। যদিও কূটনৈতিক তৎপরতার কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। ট্রাম্প ইরানে আটক এক মার্কিন নাগরিকের মুক্তির ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ইরানের বিচার বিভাগ কোনো বন্দীর মুক্তি বা বিনিময়ের কথা অস্বীকার করেছে।
নিজের যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি হয়তো আশা করছেন, বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা যাবে। তবে সাম্প্রতিক এই সংঘাতের মূলে রয়েছে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রাথমিক চুক্তির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। যুদ্ধের সময় ইরান দেখিয়েছে, তারা বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরান মনে করে, এই নৌপথ পরিচালনায় তাদের একটি ভূমিকা রয়েছে। এমনকি জাহাজ চলাচলের জন্য তারা ফি বা মাশুল নিতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা অবাধ জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অনড়। বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তেহরান ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী কোনো ছাড় দেবে বলে সামান্যই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের জাহাজ চলাচলে হামলা পুনরায় শুরু করাকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস অন্তর্বর্তী চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ পুনর্বহালসহ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ার পেছনে এটিই কারণ ছিল।
ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে তেল বিক্রি করার সুযোগ দেয়া একটি অব্যাহতিও বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। এর ফলে অন্তর্বর্তী চুক্তির অধীনে ইরানের অন্যতম একটি অর্জন কেড়ে নেয়া হয়েছে।
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন হামলার এই ঢেউকে ‘পরিস্থিতি তৈরির অভিযান’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে ইরানের যেসব সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস করতে চাইবে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে ট্রাম্পের হাতে আরও বিকল্প তৈরি করে দেয়া হচ্ছে।
জবাবে ইরান যুদ্ধের পরিসর বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ট্রাম্প যদি আরও উত্তেজনা বাড়ান, তবে উপসাগরীয় মার্কিন মিত্রদের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে তারা। এখনো ইরানের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত রয়েছে।
লোহিত সাগর পথ হুমকিতে
তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তবে লোহিত সাগরের তেল সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে ইয়েমেনের হুথিদের নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইতিমধ্যে কিছু চালান লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের কট্টর ইরানবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের প্রধান মার্ক ডুবোভিটজ এক্সে লেখেন, তেহরান ‘হতাশা থেকে হরমুজ কার্ড খেলছে’। এই ধরনের পদক্ষেপ ইরানের ‘বিশ্বকে জিম্মি করার সক্ষমতা’ ভেঙে দিতে নতুন পাইপলাইন ও শিপিং করিডোর তৈরিতে বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে আরও তরান্বিত করবে।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ট্রাম্প হয়তো এবার সেই ভুলগুলোর কিছু আবারও করে বসতে পারেন, যা তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার সময় করেছিলেন। বিদেশে হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলা এবং মার্কিনিদের অর্থনৈতিক উদ্বেগের ওপর মনোনিবেশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছিলেন তিনি।
সে সময় তিনি নিজের সিদ্ধান্তের কারণ বা কোনো স্পষ্ট বহির্গমন কৌশল ব্যাখ্যা না করেই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপই ইরানকে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনার টেবিলে এনেছিল। যদিও সেটি এখন ভেঙে পড়ে নতুন করে সংঘাতে গড়িয়েছে।
ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরানবিষয়ক গবেষক এবং সাবেক ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ এক্সে লেখেন, ‘প্রশাসন যত চাপই সৃষ্টি করুক বা নতুন হুমকি দিক না কেন, ইরানের নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করার সম্ভাবনা কম।’
তিনি লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়াতে থাকেন, তবে তেহরানও একই ভাষায় জবাব দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’





