শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ নামের একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের সমর্থনে ৫৯ বছর বয়সী এ অ্যাক্টিভিস্ট প্রতিবাদ করছিলেন। বিক্ষোভকারীদের সোমবার ভারতের সংসদ পর্যন্ত পদযাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল। কাঠফাটা গ্রীষ্মে শুধু লবণ ও পানি খেয়ে অনশনে বসেছিলেন ওয়াংচুক। এতে তার ওজন ৯ কেজির বেশি কমে যায় এবং তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগছিলেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে এখন তার জায়গায় অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন। তার ভাষ্য মতে, সংসদ পর্যন্ত পদযাত্রা চলবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। ডিপকে বিবিসিকে জানান, সকালে তিনি এক বন্ধুর বাড়িতে ফ্রেশ হতে গিয়েছিলেন। এ সময় পুলিশ এসে তাকে বের হতে দেয়নি।
শনিবার প্রতিবাদস্থলের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার (গ্রিনিচ মান সময় ০২টা) কিছু আগে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। এ সময় কয়েক ডজন পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মঞ্চে প্রবেশ করে, যেখানে অ্যাক্টিভিস্ট শুয়ে ছিলেন। তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করা প্রতিবাদকারীদেরও ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়া হয়।
চাদরের পর্দা দিয়ে ঢেকে তাকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয় পুলিশ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুতগতিতে ছুটে যেতে দেখা যায়। পরে অ্যাক্টিভিস্টের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমো এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানান, তিনি সফদরজং হাসপাতালে রয়েছেন, যেখানে ওয়াংচুককে ভর্তি করা হয়েছে।
তিনি লেখেন, ‘আমার, তার পরিবার এবং গত ২০ দিন ধরে তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা তার চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া তাকে মুখে বা শিরায় কিছুই দেয়া যাবে না।’ সফদরজং হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. চারু বাম্বা পরে বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ওয়াংচুক ‘পুরোপুরি সজাগ ও স্থিতিশীল’ রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে অনশনের কারণে তিনি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন এবং হালকা পানিশূন্যতায় ভুগছেন। এছাড়া তার শারীরিক অন্যান্য মানদণ্ড স্থিতিশীল। তাকে ক্রমাগত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তার চিকিৎসা চলছে।’ পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শের ভিত্তিতে ওয়াংচুককে সরানো হয়েছে।’
এদিকে উপ-পুলিশ কমিশনার শচীন শর্মা বলেন, ‘সোনম ওয়াংচুককে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য একটি সরকারি হাসপাতালে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।’ তিনি বৃহস্পতিবারের দিল্লি হাইকোর্টের একটি নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন। ওই নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিয়মিত ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা দিতে বলা হয়।
অনশন ভাঙার জন্য ক্রমবর্ধমান আহ্বান সত্ত্বেও ওয়াংচুক অনড় ছিলেন। ভঙ্গুর স্বাস্থ্য নিয়েও সোমবারের সংসদ পদযাত্রায় তিনি অংশ নেবেন বলে জানিয়ে আসছিলেন। কয়েক দিন আগে ৩০০ বছরের পুরোনো মানমন্দির যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থলে জমায়েত হওয়া লোকজনের উদ্দেশে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি বাইরে থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছি, কিন্তু ভেতর থেকে শক্তিশালী।’ তার এই বক্তব্য উচ্ছ্বাস ও করতালিতে সিক্ত হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সংসদ পর্যন্ত পদযাত্রা করব এবং গণতন্ত্রের বেদিতে আমাদের আবেদন পেশ করবো।’ অ্যাক্টিভিস্ট এরপর রসিকতা করে বলেন, পদযাত্রার আগে যদি তিনি মারা যান, তবে তার ‘ভূত পদযাত্রায় যোগ দেবে’।
এই অ্যাক্টিভিস্টের পদযাত্রায় অংশ নেয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ডিপকে জানিয়েছেন, সোমবারের পদযাত্রা পরিকল্পনা অনুযায়ীই হবে।তিনি বলেন, ‘তারা যদি মনে করে যে ওয়াংচুককে সরিয়ে দিয়ে এই আন্দোলন থামিয়ে দেবে, তবে তারা ভুল ভাবছে। আমরা এখানেই থাকব এবং ২০ জুলাই সংসদ পর্যন্ত পদযাত্রা করবো।’ ভারতের শীর্ষ পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অন্যান্য অনিয়মের প্রতিবাদ জানাতে চলতি বছরের মে মাসে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে সিজেপি। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই আন্দোলন।
নিজেদের ‘কক্রোচ’ (তেলাপোকা) বলে দাবি করা প্রতিবাদকারীরা এক মাস ধরে বিক্ষোভ করছেন। কিছু ছাত্র সংগঠনের সদস্যরাও ওয়াংচুকের সঙ্গে অনশনে যোগ দিয়েছেন।মে মাসের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় হবু ডাক্তারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর থেকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছেন প্রতিবাদকারীরা। তাদের ভাষ্য, মন্ত্রীকে নৈতিক দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে। প্রধান সিজেপি ও এর সমর্থকদের ‘বিশৃঙ্খল উপাদানগুলোর বি-দল’ বলে অভিহিত করে উড়িয়ে দিয়েছেন। মোদি সরকার এখনো প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি।
শনিবারের এই ঘটনার পর সিজেপি মোদির পদত্যাগও দাবি করেছে। ডিপকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আসছিলাম। তবে এই ঘৃণ্য কাজের পর আমরা এখন নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করবো।’ বিরোধী কয়েকটি দলের সংসদ সদস্যরা ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে চালানো এই অভিযানের নিন্দা জানিয়েছেন। তারা একে ‘মর্মান্তিক জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা’ এবং ‘গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারকে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের নেতাদের কাছ থেকে চাপ বাড়ছিল। বৃহস্পতিবার দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল ওয়াংচুককে দেখতে আসেন।
সিজেপির শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কেজরিওয়াল হাতজোড় করে অ্যাক্টিভিস্টকে অভিবাদন জানাচ্ছেন এবং হাত মেলাচ্ছেন। প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। কেজরিওয়াল বলেন, ‘প্রতি বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় এবং তরুণেরা এর মূল্য চোকায়। আমি সরকারের কাছে ছাত্র ও ওয়াংচুকের কথা শোনার আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রধানকে তার পদ থেকে সরানো এবং তার জায়গায় ওয়াংচুককে বসানো উচিত।’





