ট্রাম্প আশাবাদী হলেও তেহরান দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান স্থগিতের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখেছে বলে মনে হচ্ছে। সোমবার সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাক তাদের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে। পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতে সর্বশেষ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে ওয়াশিংটন গত শনিবার হঠাৎ করেই ইরানে দুই সপ্তাহের বিমান হামলা স্থগিত করে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের ভালো আলোচনা চলছে। আমি মনে করি কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি হয়, ভালো। আর না হলে আমরা আবার দুই দিন আগে যা করছিলাম, সেখানেই ফিরে যাব।’ পরে মিশিগানে এক নির্বাচনী সমাবেশে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের ঘুষ দিয়ে বশ করা যাবে না। তাদের হারাতে হবে এবং আমরা তাদের বেদম প্রহার করব। তবে দেখা যাক কী হয়। আপাতত খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এখনো চলছে এবং ইরান কূটনীতির পথ ছাড়েনি। তবে ইরান নিজে থেকে আলোচনার অনুরোধ করেছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোকে ‘বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বাঘাই বলেন, ‘এটি আমাদের চরিত্রে নেই।’
গত রোববার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা পর্যন্ত ইরানও তাদের হামলা বন্ধ রাখবে। তবে সোমবার ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জলসীমায় জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হুমকি দিচ্ছে এবং ‘অবৈধ নৌ অবরোধ’ চালানোর চেষ্টা করছে, যা এই অঞ্চলে সংঘাত আরও বাড়ানোর শামিল।
এদিকে, সৌদি আরব জানিয়েছে, রিয়াদসহ বিভিন্ন তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা ড্রোনগুলো তারা ভূপাতিত করেছে। এই ড্রোনগুলো ইরাক থেকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ছুড়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। এর জবাব দেয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে বলেও জানিয়েছে সৌদি আরব। অন্যদিকে, ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরা জানিয়েছে, সৌদি আরবের ড্রোন অনুপ্রবেশের প্রতিশোধ হিসেবে তারা লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহকারী পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে।
তেহরান আরও জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্প এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অবাধ রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন।
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে জনরোষ ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ওপর চাপ তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে চালানো রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়ে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মাত্র প্রতি তিনজনে একজন মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা এই সংঘাত শুরুর পর সর্বনিম্ন। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প তার লক্ষ্য স্পষ্ট করে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
টানা ১৩ রাতের বোমাবর্ষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান স্থগিত হওয়া এবং ট্রাম্পের আলোচনার ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮১ দশমিক ৯৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমেছে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে তার সামরিক উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, বোমা হামলার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য লক্ষ্যের সীমায় পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন, তাদের হাতে হামলার জন্য লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা কমে আসছে এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও ট্রাম্প অস্ত্রের মজুত ঘাটতির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এক ‘সংশ্লিষ্ট সূত্রের’ বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সোমবার অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেয়ার চেষ্টাকারী ছয়টি ‘বিধিভঙ্গকারী জাহাজ’ ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশ অনুযায়ী ওমান উপকূলের কাছাকাছি রুট ব্যবহার করা জাহাজের ওপর তেহরান হামলা চালানোর পরই ট্রাম্প নতুন করে বোমা হামলা শুরু করেছিলেন। তবে ইরান বলছে, জাহাজগুলো কেবল তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলঘেঁষা চ্যানেল দিয়েই যাতায়াত করতে পারবে এবং এই পথে তারা ট্রানজিট ফি আরোপের পরিকল্পনা করছে।
দুই সপ্তাহের এই নতুন হামলায় ইরানে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে সেতু, সুড়ঙ্গসহ সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলায় চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর সমাধানে আগস্টের শেষ নাগাদ আলোচনা শুরুর একটি কাঠামোগত চুক্তিতে গত জুনে সম্মত হয়েছিল ওয়াশিংটন ও তেহরান। তবে হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের ভাষার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটন বলছে, এই চুক্তি অনুযায়ী তেহরানকে অবাধ চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, এটি তাদের জাহাজ চলাচল তদারকির অনুমতি দিয়েছে।





