২৪ বছর বয়সী অরোরা বলেন, ‘আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম।’ এই প্রতিবেদনের অন্যদের মতো অরোরাও শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশের শর্তে কথা বলেছেন। তবে সেই আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) মা ও মেয়েকে আটক করে টেক্সাসের একটি পারিবারিক আটক কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়।
রয়টার্সের হাতে আসা মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অফিস অব রিফিউজি রিসেটেলমেন্টের (ওআরআর) দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত ১২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। অরোরা ও তার মেয়েও তাদেরই একজন।
যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৮০ সালে ওআরআর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে সংস্থাটি অরোরার মেয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আসা অভিভাবকহীন শিশুদের আশ্রয় দেয়ার দায়িত্বও পালন করে আসছে।
ঐতিহাসিকভাবে এই শিশুদের দেখভাল অভিবাসন অভিযান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হতো। ২০০৮ সালের একটি আইনে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, স্পন্সরদের আইনি অবস্থান যেমনই হোক না কেন, শিশুদের সবচেয়ে কম বিধিনিষেধমূলক পরিবেশে রাখা হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব ছেড়ে দেয়া হবে। এতে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসী পরিবারগুলোও আইসিইর ভয় ছাড়াই আবার একত্র হতে পারত।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ওআরআর অভিভাবকহীন শিশু, তাদের স্পন্সর (সাধারণত অভিভাবক বা আত্মীয়) এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে ৪ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ‘তথ্যসূত্র’ আইসিইকে দিয়েছে। এতে এসব মানুষ আটক ও বহিষ্কারের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। রয়টার্স ও অন্যান্য গণমাধ্যম এর আগে ওআরআর ও আইসিইর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার কথা জানালেও, এবারই প্রথম অভিবাসন অভিযানের জন্য তথ্য আদান-প্রদানের প্রকৃত চিত্র উঠে এলো।
বাইডেন প্রশাসনের সময় ওআরআরের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেন স্মায়ার্স বলেন, আইসিইর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের যেসব সুরক্ষাব্যবস্থা ছিল, তা ‘সম্পূর্ণভাবে উল্টে দেয়া হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘তারা আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে বহিষ্কারের জন্য শিশু কল্যাণ কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।’
রয়টার্সকে দেয়া এক বিবৃতিতে ওআরআর জানিয়েছে, ‘শিশুদের আটকের সঙ্গে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই।’ অভিবাসন অভিযান সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য তারা আইসিইর মূল সংস্থা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) কথা উল্লেখ করেছে। ডিএইচএস অবশ্য জানিয়েছে, ‘যাচাই ছাড়াই স্পন্সরদের’ কাছে (যাদের কারও কারও অপরাধের রেকর্ডও রয়েছে) থাকা অভিভাবকহীন শিশুদের খুঁজে বের করতেই এই তথ্য দেয়া হচ্ছে।
‘আমি শুধু কাজই করি’
কাজ ও নিরাপত্তার সন্ধানে দুই বছর আগে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন অরোরা। মেয়ে ছোট থাকায় মরুভূমি পাড়ি দেয়ার ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়দের কাছে রেখে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অরোরা মিসিসিপিতে বাসাবাড়িতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ শুরু করেন। গত আগস্টে এক আত্মীয় তার মেয়েকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য রেখে আসেন। পরিবারগুলো পুনরায় একত্র হওয়ার এটাই সাধারণ কৌশল।
কর্মকর্তারা মেয়েটিকে অভিবাসী শিশুদের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন এবং অরোরা মেয়েকে ছাড়িয়ে আনতে দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করেন। ছয় মাসে তিনি সংস্থাটিকে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র জমা দেন। নথি অনুযায়ী, অরোরার কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে স্পন্সরদের যাচাই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু নতুন ধাপ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের সব সদস্যের আঙুলের ছাপ নেয়ার বিধানও রয়েছে। এর ফলে ২০২৪ অর্থবছরে অভিভাবকহীন শিশুরা যেখানে গড়ে ৩০ দিন হেফাজতে থাকত, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ১৯৪ দিনে দাঁড়িয়েছে বলে ওআরআরের তথ্য বলছে। ওআরআর জানিয়েছে, শিশুদের ক্ষতি থেকে বাঁচাতেই এই যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হয়েছে।
অরোরা জানান, মেয়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক দিন আগে অভিবাসন কর্মকর্তারা তার বাসায় এসে মেয়ে সম্পর্কে খোঁজখবর নেয় এবং পরের সপ্তাহে আইসিই কার্যালয়ে হাজির হতে বলে। ওই সাক্ষাতে কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তার কোনো সমস্যা আছে কি না। অরোরা জানান, তিনি বলেছিলেন, ‘না, কারণ আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি শুধু কাজই করি।’ কিন্তু ওই সাক্ষাতেই তাকে ও তার মেয়েকে আটক করে টেক্সাসের ডিলি শহরের পারিবারিক আটক কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
তিন সপ্তাহ সেখানে থাকার পর ছাড়া পান তারা। মুক্তির সময় অরোরার পায়ে অ্যাঙ্কেল মনিটর পরিয়ে দেয়া হয় এবং অভিবাসন আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত হাজিরা দিতে বলা হয়। এরই মধ্যে মিসিসিপিতে অরোরার বাড়িওয়ালা তাকে উচ্ছেদ করে তার জিনিসপত্র ফেলে দিয়েছে। এরপর এক বন্ধুর আশ্রয়ে মেয়েকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া চলে গেছেন অরোরা। তার ভয়, শিগগিরই হয়তো তাদের বহিষ্কার করা হবে। তার মেয়ে সম্পর্কে অরোরা বলেন, ‘সে এখনো রাতে ঘুম থেকে উঠে কাঁদে, ভাবে যে সে এখনো আটক অবস্থায় আছে।’
অভিযানের জালে স্পন্সররাও
অরোরা ও তার মেয়ে অন্তত একসঙ্গে আছেন। কিন্তু আরও অনেক পরিবার আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে সহিংসতা থেকে বাঁচতে গুয়াতেমালা ছাড়েন মারলেনি ও তার ছোট ছেলে। অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে টেক্সাসে বসতি গড়েন তিনি, যেখানে নির্মাণাধীন স্থাপনা পরিষ্কারের কাজ করতেন। তার বড় ছেলে ভিক্টর দেশে আত্মীয়দের কাছে থেকে যায়। পরে চাচা খুন হওয়ার পর ভিক্টরও উত্তরের পথে রওনা দেয় এবং সীমান্তে গিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
চার মাস ওআরআরের হেফাজতে থাকার পর গত এপ্রিলের শেষদিকে ১৮ বছর হওয়ার এক দিন আগে ভিক্টর মুক্তি পায়। পরিবারটি ঘটা করে উৎসব পালন করে। মারলেনি বলেন, ‘আমি খুব খুশি ছিলাম। ঈশ্বর আমার জন্য কী রেখেছেন, তখন তা জানতাম না।’ ভিক্টরকে ছাড়িয়ে আনতে তিনি ও তার সঙ্গী তাদের কর প্রদানের রেকর্ড ও আঙুলের ছাপসহ বিস্তারিত কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকায় এসব তথ্য দিতে তার কোনো দ্বিধা ছিল না।
কিন্তু ভিক্টর ছাড়া পাওয়ার দুই মাস পরই কাজে যাওয়ার সময় গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে বন্দুকের মুখে মারলেনি ও তার সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করে আইসিই কর্মকর্তারা। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ডিএইচএস জানিয়েছে, তারা মারলেনির ‘রুমমেটের’ (সঙ্গী) বিরুদ্ধে ফৌজদারি সার্চ ওয়ারেন্ট কার্যকর করছিল। তবে কী ধরনের অপরাধের অভিযোগ ছিল বা কীভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল, সে সম্পর্কে ডিএইচএস কোনো তথ্য দেয়নি।
বন্দুক দেখে মারলেনি গুয়াতেমালার সহিংসতার ভয়াবহ স্মৃতিতে ফিরে যান বলে জানান। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা এক প্রতিবেশী তখন ভিক্টরকে খবর দেন। ভিক্টর তখন পরিবারের অ্যাপার্টমেন্টে তার ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে গ্যালভেস্টন-হিউস্টন ইমিগ্র্যান্ট রিপ্রেজেন্টেশন প্রজেক্টের (জিএইচআইআরপি) একজন আইনি সহকারীকে ফোন করে।
জিএইচআইআরপির ব্যবস্থাপনা আইনজীবী আলেক্সা সেনদুকাস বলেন, ‘আমরা দেখছি স্পন্সরদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেককেই আটক করা হচ্ছে।’ ভিক্টর এখন একাই তার ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করছে। মায়ের গ্রেপ্তারের পর তার আদালতে হাজিরা দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিশৃঙ্খলার কারণে সে বিষয়টি ভুলে যায়। এখন বহিষ্কারের নির্দেশের মুখোমুখি হয়ে তার অভিবাসন মামলাটি পুনরায় চালু করার জন্য একজন আইনজীবী খুঁজছে সে। ভিক্টর বলে, ‘আমাকে সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।’





