এক রাতেই নিজের সব সৌন্দর্য হারিয়ে ধূসর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে কলম্বিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর পেরেইরা। ধসে যাওয়া কংক্রিটের নিচেই হয়তো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন শত শত মানুষ। অথচ, হতভাগ্য এই দুর্গতদের আর্তনাদ পৌঁছাচ্ছে না উদ্ধারকারীদের কাছে। অভিযানের সবশেষ খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তাই হতভম্ব এই সংবাদকর্মী। জানালেন, এগিয়ে আসার মানুষ আছে, কিন্তু ভারী এই কংক্রিট সরানোর সরঞ্জাম মিলছে না।
কিছুক্ষণ আগে এক মা ও তার মেয়ের সঙ্গে কথা হল। খাবার নিয়ে এসেছেন তারা। এই দেশ, এই শহরের মানুষ- তাদের টানেই ছুটে এসেছেন। জানালেন, যতক্ষণ এখানে অভিযান চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরও দায়িত্ব আছে।
১৯৯৯ সালের হাজারো মানুষের প্রাণহানির পর একুশ শতকে এটাই কলম্বিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, ঘণ্টার ঘণ্টায় মৃত্যুর নতুন পরিসংখ্যান সবকিছু ছাপিয়ে এই মুহূর্তে নতুন প্রেসিডেন্ট এসপ্রিয়েলা'র সামনে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষার নাম উদ্ধার অভিযান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিশেষজ্ঞদের বিচারে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল অবস্থায় ৫ অঞ্চল। তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে ভবনধসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রাণহানিও সর্বোচ্চ। এপি সেন্টার সান হোসে দেল পালমারের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই অনুন্নত, এলাকাটিও দুর্গম। লিস্টের বাকি তিন শহর পেরেইরা, মানিজালেস ও রিজারালদায় বহু আবাসিক ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ক্যাথেড্রালসহ সাধারণ পরিকাঠামো ধসে গেছে। ফুরিয়েছে গোল্ডেন আওয়ার বা ভূমিকম্পের প্রথম ৭২ ঘণ্টার দুই তৃতীয়াংশ। ৩০ ঘণ্টায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে সাড়ে ৫শ মানুষকে। আর হদিস মেলেনি প্রায় ৩ হাজার মানুষের।
ভারী যন্ত্রপাতি নেয়ার সুযোগ না থাকলে ও খালি হাতে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ফায়ার সার্ভিস, জরুরি উদ্ধারকারী দল, অতিরিক্ত এক হাজার নিরাপত্তা কর্মী ও সেনাসদস্য রাতভর অভিযান চালিয়েও সামলাতে পারছেন না পরিস্থিতি। ভূমিকম্পের প্রথম ৩০ ঘণ্টায় নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার মানুষ। খালি হাতে নেমেছেন স্থানীয়রাও। কাজ করছে বিভিন্ন বৈশ্বিক মানবিক সংস্থা। দেখা যাচ্ছে, ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের পর অন্তত ২১টি আফটার শকের কারণে- উদ্ধার কাজের ঝুঁকিও বেড়েছে কয়েকগুণ।
তবে, সিএনএনের বিশ্লেষণ এমন ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবিলার যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না কলম্বিয়ার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, দুর্বল অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং চলমান রাজনৈতিক সংকট।
এপি সেন্টার ও এর আশেপাশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় কাজে আসছে না ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম। তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে ধসে যাওয়া সাধারণ অবকাঠামোগুলোর বেশিরভাগেরই দেয়ালের স্তর খুবই পাতলা, তাই কম্পনের অনুপাতে ক্ষতি হয়েছে বেশি।
এখানেই শেষ নয়, গোটা কলম্বিয়া যখন পরিবারের হারানো স্বজন-বন্ধু-প্রতিবেশী-সহকর্মীর খোঁজে দিশেহারা তখন পরবর্তী বিপর্যয়ের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা জাতিসংঘের। উদ্ধার অভিযান শেষ হতে না হতেই খাদ্য সংকটে পড়তে যাচ্ছে ভূমিকম্প কবলিত দেশটি, খাবার-জরুরি সামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও আছে উদ্বেগ। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনসেবামূলক অবকাঠামো আগে থেকে দুর্বল। আর সিজিটিনের পর্যবেক্ষণ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে কিছু অঞ্চলে ত্রাণ পাঠাতেও নিতে হবে জীবনের ঝুঁকি।





