কিয়েভের দিনিপ্রোভস্কি এলাকায় ইউক্রেনের প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এইচইউআর) ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সেবার (এসবিইউ) মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। এইচইউআর বিদেশ গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সামরিক শাখা এবং এসবিইউ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয় দেখে।
ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসবিইউ রাশিয়ান ভলান্টিয়ার কোরের (আরভিসি) উপ-কমান্ডার স্তেপান কাপলুনভকে আটক করার পর পরিস্থিতির অবনতি হয়। আরভিসি এইচইউআরের অধীনস্থ একটি বাহিনী, যা ইউক্রেনের হয়ে লড়াই করছে। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা দিমিত্রো লিতভিন এসবিইউ ও এইচইউআর উভয়ের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের দপ্তর জানিয়েছে, রাশিয়ার ফেডারেল নিরাপত্তা সেবার (এফএসবি) একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এসবিইউ কর্মকর্তারা অভিযান চালাচ্ছিলেন। দপ্তরটির বিবৃতিতে বলা হয়, একটি ঠিকানায় তল্লাশির সময় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি এসবিইউর তদন্ত দলের ওপর হামলা চালায় এবং গাড়ি দিয়ে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পথ আটকে দেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলাকারীরা ছিল এইচইউআরের একটি ইউনিটের সদস্য।
তবে এইচইউআরের বিশেষ ইউনিট তিমুরের কমান্ডার রেডিও লিবার্টি-রেডিও ফ্রি ইউরোপকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এসবিইউ দিনের আলোয় কাপলুনভকে ‘অপহরণ’ করেছে এবং ঘটনাস্থলে প্রথমে গুলি ছোড়ে এসবিইউই।
কাপলুনভের আইনজীবী তারাস বোরোভস্কি ইউক্রেনস্কা প্রাভদাকে জানান, একজন এইচইউআর কর্মকর্তার পায়ে গুলি লেগেছে এবং তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। দ্বিতীয় কর্মকর্তার অবস্থাও গুরুতর। তৃতীয় কর্মকর্তা সামান্য আহত হয়েছেন।
স্তেপান কাপলুনভ রাশিয়ার নাগরিক হলেও ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংযুক্তির পর ইউক্রেনে চলে আসেন এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি আরভিসিতে কাজ করছেন। ইউক্রেনের পক্ষে লড়াইয়ের কারণে মস্কো তাকে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। নিউ ভয়েস অব ইউক্রেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রেডিও এনভিকে কাপলুনভ জানান, তাকে অপহরণ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে—রাশিয়ার এফএসবির সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সন্দেহে।
ঘটনার পর জেলেনস্কি টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে জানান, তিনি প্রসিকিউটর জেনারেল রুসলান ক্রাভচেনকোর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং রাষ্ট্রীয় তদন্ত ব্যুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তিনি বলেন, ‘জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, জড়িতদের বিষয়ে নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানদের কর্মীবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়াসহ উভয় সংস্থায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনে গুলি কেবল রুশ দখলদারদের বিরুদ্ধে দেশ রক্ষার ক্ষেত্রেই চলতে পারে। অন্য কোনো গোলাগুলিকে রাষ্ট্র কখনো বৈধ মনে করে না।’
এরই মধ্যে এসবিইউর রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বিভাগের প্রধান ওলেহ খ্রামভকে বরখাস্ত করেছেন জেলেনস্কি। প্রেসিডেন্ট অফিসের প্রধান ও সাবেক এইচইউআর প্রধান কিরিলো বুদানভ পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কাউকে দণ্ডমুক্তভাবে সেনাদের অপহরণ করার, শহরের রাস্তায় গুলি চালানোর বা অপরাধমূলক আদেশ দেয়ার অধিকার নেই।’
এই ঘটনা এমন একটি সময়ে ঘটল যখন চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেন নিরাপত্তা কাঠামোয় একের পর এক পরিবর্তন আনছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেলেনস্কি এসবিইউ প্রধান ভাসিল মালিউককে পদ থেকে সরিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে নিয়োগ দেন। বুদানভকে নতুন চিফ অব স্টাফ এবং বৈদেশিক গোয়েন্দা সেবার প্রধান ওলেহ ইভাশচেনকোকে এইচইউআরের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
জুলাইয়ে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে বরখাস্ত করে মিখাইলো দ্রাপাতিকে সেই পদে নিয়োগ দেন জেলেনস্কি। এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইল ফেদোরোভকে সরানোর প্রতিবাদে কিয়েভে ছয় দিন ধরে বিক্ষোভ চলে।
বার্লিনভিত্তিক কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম কার্নেগি পলিটিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলেনস্কির এই রদবদল জোরপ্রয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার সচেতন প্রয়াসের ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত আবার শুরু হওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
গত নভেম্বরে জেলেনস্কির ব্যবসায়িক অংশীদার ও রাজনৈতিক সহযোগীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগে একটি দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ইউক্রেনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা এনএবিইউ ও বিশেষ দুর্নীতিবিরোধী প্রসিকিউটরের দপ্তর (এসএপিও) ভিডিও ও অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ করে। সেগুলোতে পরমাণু বিদ্যুৎ খাতের একচেটিয়া ব্যবসা থেকে কয়েক কোটি ডলারের ঘুষ নেয়ার আলাপের তথ্য পাওয়া যায়।
২০১৯ সালের নির্বাচনে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সুবাদে ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া জেলেনস্কি জুলাইয়ে এনএবিইউ ও এসএপিওর স্বায়ত্তশাসন কমানোর উদ্যোগ নেন। তবে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন।





