সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী সরকারের রাজধানী এডেনের সাথে কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ, অবরুদ্ধ তাইজকে যুক্ত করা জরুরি একটি সাপ্লাই রুট একদিন আগেই বিচ্ছিন্ন করে দেয় হুথিরা। এরপরই দেশজুড়ে তীব্র রূপ নেয় সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের লড়াই।
দক্ষিণ-পশ্চিমের তাইজ প্রদেশের চতুর্দিকে লড়াই তীব্রতর হতে থাকার মধ্যেই, উত্তরাঞ্চলে শেষ প্রধান ঘাঁটি মারিবের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেও হিমশিম খাচ্ছে ইয়েমেন সরকার। এমন পরিস্থিতিতে হুথি বিদ্রোহীদের দখলকৃত সবগুলো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে, রোববার একযোগে অভিযান শুরু করে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী।
ইয়েমেন সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি বলেন, ‘আগ্রাসী এই যুদ্ধের লক্ষ্য- রাষ্ট্রের সকল ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা, পূর্ণ জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং হুথি বিদ্রোহীদের জোরপূর্বক দখলকৃত আমাদের সবগুলো অঞ্চলে নৃশংস অভ্যুত্থানমূলক সব কার্যক্রমের অবসান ঘটানো।’
গেলো মাসে হুথিদের আকস্মিক উত্থানের সাক্ষী হয় আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ দেশগুলো। কয়েক সপ্তাহে হুথিরা দখল করে ফেলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং লোহিত সাগর উপকূলের দেড়শো কিলোমিটার এলাকা। আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি অচলাবস্থা ভাঙতে মরিয়া সৌদি আরব ও মিত্ররা। এমন পরিস্থিতিতেই হুথিবিরোধী অভিযান জোরদার করলো ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।
আরও পড়ুন:
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বলেন, ‘এই অভিযান সানা, সাদা, হুদাইদাহ, আমরান, ধামার, ইব বা অন্য কোনো প্রদেশেই আমাদের জনতার বিরুদ্ধে নয়; কোনো সম্প্রদায় বা গোত্রের বিরুদ্ধেও এই যুদ্ধ নয়। বরং রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারে, অতীতের ভুল সংশোধনে এবং অস্ত্রের জোরে আমাদের জনগণের ইচ্ছা বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হরণ প্রতিরোধের জন্য সংগ্রাম।’
এরই মধ্যে নির্বিচার হামলার শিকার হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগী একজন বলেন, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, সব তো সামনেই আছে, এখানে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নেই, কোনো সামরিক এলাকা বা এমন কিছুই নেই, ছিলোও না। সামান্য আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেছি আমরা সবাই, এটাই অনেক। কিন্তু কারখানাটা শেষ হয়ে গেলো।’
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত হুথিরা ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ইয়েমেনের বেশিরভাগ মানুষের বাসও এসব অঞ্চলেই। গত কয়েক বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের ধারাবাহিক হামলা সত্ত্বেও হঠেনি হুথিরা। বরং ইরানের সহায়তায় আরও উন্নত করেছে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক সক্ষমতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের হঠানোর এই অভিযানে বড় বাধার মুখে পড়বে ইয়েমেন।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল ওমেইসি বলেন, ‘ইরানের দিক থেকে শক্তি বেড়েছে তাদের। ইরানের কাছ থেকে অস্ত্রের প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি বাইরে থেকেও তারা জনশক্তি, অস্ত্র ইত্যাদি পাচ্ছে। চীনের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাচ্ছে। তাই, তারা আসলে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কয়েক বছর আগে সৌদি আরব যাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলো, সেই হুথি আর আজকের হুথিরা এক নয়। এখন তারা একেবারেই আলাদা এবং অনেক বেশি শক্তিশালী।’
ইয়েমেনে গেলো ২৪ ঘণ্টায় হুথিদের স্থাপনা লক্ষ্য করে ১০৬টির বেশি বিমান হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জবাবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ আর খুরাইসে ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ড্রোন হামলা চালায় হুথিরাও। হুথি আর সৌদি আরবকে সংঘাত বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে আনতে মধ্যসস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান ।





