দৈনিক বেঁচে থাকার লড়াই
গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রা এখন কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তিন বছরে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইলি হামলায় আরও ১ হাজার ৪৬২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তা প্রয়োজন। বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী ছাউনিতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। এ ছাড়া ৯১ শতাংশ পরিবার তীব্র পানি সংকটে ভুগছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ায় জরুরি সেবা ও পরিবারগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে জ্বালানির তীব্র সংকট চলছে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) জানিয়েছে, গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। সেখানে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে ৭৮ শতাংশে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু আয় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের আয়ের মাত্র ১৭ শতাংশ। জিনিসপত্রের দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতি গবেষক রামি আল-জাইঘ জানান, এই যুদ্ধ ‘সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে’। উপত্যকায় নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয়ায় মানুষ এখন ডিজিটাল ওয়ালেটের ওপর নির্ভর করছেন।
বিপন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা তিন বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ শিশু পুরোপুরি শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, উপত্যকার ৩৬টি হাসপাতালের সব কটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল আংশিকভাবে সেবা দিতে পারছে। তীব্র ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ক্যানসার চিকিৎসা ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা কার্যত বন্ধের মুখে।
সংকুচিত হচ্ছে ভূখণ্ড
ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে গাজার ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা ইউরো-মেড মনিটরের হিসাবে, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা এখন ইসরাইলি বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। ফলে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি উপত্যকার মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষিণের রাফাহ শহরের বেশিরভাগ অংশই এখন ইসরাইলের দখলে।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শূন্যতা
যুদ্ধের কারণে গাজার অভ্যন্তরীণ বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দফায় দফায় হামলা হওয়ায় একটি বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ত্রাণ লুটপাটের ঘটনাও বাড়ছে। টানা তিন বছরের যুদ্ধ শেষে গাজাবাসীর সামনে এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।





