মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: হাউস ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে

আলেকজান্দ্রিয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোট দিচ্ছেন ভার্জিনিয়ার ভোটাররা
বিদেশে এখন
0

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম সরাসরি ব্যালটে নেই, তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে তার ওপরই নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসে তার মেয়াদের বাকি দুই বছরের ক্ষমতার বিস্তার। দেশটির নতুন আইন প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দের চাবিকাঠি মূলত আইনসভার এই দুই কক্ষের হাতে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেভাবে ভোট হয়
প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভা কংগ্রেসের সার্বিক গঠন নির্ধারিত হয়। এবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সবকটি অর্থাৎ ৪৩৫টি আসনে এবং ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্স দায়িত্ব নেয়ায় তাদের ছেড়ে আসা ফ্লোরিডা ও ওহাইওর দুটি বিশেষ আসনেও নির্বাচন হচ্ছে। এছাড়া একই সঙ্গে দেশের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন ছাড়াও রাজ্য আইনসভা ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বহু পদে ভোট নেয়া হবে।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর ভোটারদের এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হয়। ১৯৪৬ সালের পর থেকে হওয়া সব মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে প্রায় ২৬টি এবং সিনেটে বেশ কয়েকটি আসন হারায়।

হাউস ও সিনেটের ক্ষমতার সমীকরণ
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সামান্য ব্যবধানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর যেকোনো একটি কক্ষ হাতছাড়া হলে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা যেকোনো নতুন আইন আটকে দেয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরকারি তদন্ত শুরু করার আইনি ক্ষমতা পাবে।

জনসংখ্যার অনুপাতে নির্ধারিত নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন। এছাড়া একটি আসনে স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সমর্থন দিচ্ছেন এবং দুটি আসন শূন্য রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের কেবল তিনটি অতিরিক্ত আসন নিশ্চিত করতে হবে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রায় ৩৫টি আসনের ফলাফলই পুরো কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠিক করে দিতে পারে।

উচ্চকক্ষ সিনেটের ক্ষেত্রে ১০০টি আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে, যার মধ্যে ২২টি রিপাবলিকান এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩টি এবং স্বতন্ত্রসহ ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি আসন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বেশি পেতে হবে। আসন সংখ্যা ৫০-৫০ সমতায় পৌঁছালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্সের টাইব্রেকিং ভোটের সুবাদে নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থেকে যাবে।

গুরুত্বপূর্ণ যেসব আসনের দিকে নজর
সিনেটে নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ১৩টি আসন রক্ষার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের আসন ছিনিয়ে নিতে হবে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে বর্তমান ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের বিরুদ্ধে লড়ছেন রিপাবলিকান মাইক কলিন্স। মিশিগানের উন্মুক্ত আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের মুখোমুখি হচ্ছেন রিপাবলিকান মাইক রজার্স। নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান জন সুনুনু। এছাড়া মেইন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের বিরুদ্ধে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট রয় কুপার ও রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলি মুখোমুখি হচ্ছেন। ওহাইও, আলাস্কা, টেক্সাস ও আইওয়াতেও জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।

নির্বাচনের প্রধান ইস্যু
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। বিশেষ করে জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং আবাসন সংকট সাধারণ নাগরিকদের বাজেটকে মারাত্মক চাপে ফেলেছে। এর বাইরে গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভোটারদের প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের দ্রুত প্রসারের ফলে জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া চাপও নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

ক্ষমতার রদবদলে সম্ভাব্য প্রভাব
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা সরকারি বাজেট আটকে দিতে পারে, যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ার (শাটডাউন) ঝুঁকি বাড়বে। তারা চাইলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে। তবে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো যায় না। অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, কংগ্রেসের ভেতরে বাধার মুখে পড়লে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময়ে ঘরোয়া রাজনীতির চেয়ে পররাষ্ট্রনীতির দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।

অন্যদিকে সিনেট ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তারা ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ফেডারেল বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের অনুমোদন আটকে দিতে পারবে। তবে উভয় কক্ষ হাতছাড়া হলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো দেয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল থাকবে। সেই ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়, যা বিরোধী শিবিরের পক্ষে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

চূড়ান্ত ফলাফল জানার সময়সীমা
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা থেকেই ফলাফল আসতে শুরু করবে। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোতে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে কয়েক দিন এমনকি সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে ডাকযোগে আসা ও বিশেষ ব্যালট গণনায় সময় লাগার কারণে প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে থাকা প্রার্থী পরবর্তী সময়ে পিছিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী এককভাবে ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে আগামী ১ ডিসেম্বর সেখানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

—আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম