মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: যেভাবে নির্ধারিত হবে জয়-পরাজয়

ক্যাপিটল হিল ঘিরে লাল-নীলের লড়াই: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ক্ষমতার সমীকরণ
বিদেশে এখন
0

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাবে, তা নির্ভর করছে সামান্য কয়েকটি আসনের জয়-পরাজয়ের ওপর। আইনসভার উভয় কক্ষে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ব্যবধান এতটাই কম যে মাত্র চার আসনের হেরফেরেই ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ২১৮ এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪। এছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে রয়েছেন। ফলে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে হবে। অন্যদিকে ১০০ আসনের সিনেটে রিপাবলিকানরা ৫৩–৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। সেখানেও নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন অতিরিক্ত চারটি আসন। টেক্সাস ও কানসাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিসংশ্লিষ্ট অন্তত ১২টি আসনের ফলাফল পুরো সিনেটের ভাগ্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখবে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বদল হলে বদলে যাবে স্পিকারের পদও। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস হতে পারেন পরবর্তী স্পিকার। সেক্ষেত্রে তিনি হবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান স্পিকার। জেফ্রিস স্পিকার হলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও কথিত নজিরবিহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্য, আবাসন ও জ্বালানি খরচ কমানোর আইন প্রণয়নে জোর দেবে ডেমোক্র্যাটরা। বিপরীতে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলে বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন বা অন্য কোনো রিপাবলিকান নেতা স্পিকার হবেন। তারা কর ছাড়, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ কমানোর নীতিতে এগোবেন।

জয়-পরাজয় নির্ধারণে বেশ কিছু নির্বাচনি এলাকা বিশেষ নজরে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিউ ইয়র্কের একটি জেলা, যেখানে রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক ললার লড়ছেন। এই আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস জয়ী হয়েছিলেন। এছাড়া পেনসিলভানিয়ার দুটি ও নিউ জার্সির একটি আসন নিজেদের দখলে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি নেব্রাস্কার একটি দোদুল্যমান আসন রয়েছে আলোচনায়, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কৃষক ও পরিবহন শ্রমিকদের অসন্তোষ ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচনি জরিপ অনুযায়ী, বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে। এছাড়া ২০২৪ সালে ট্রাম্পের পক্ষে যাওয়া হিস্পানিক বা লাতিনো ভোটারদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক হতাশা ও কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে আবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত নয়; রিপাবলিকানদের বিপুল নির্বাচনি তহবিল এবং বামপন্থি প্রার্থীদের উত্থান নিয়ে মধ্যপন্থি ভোটারদের সংশয় রিপাবলিকানদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়। ২০১০ সালে বারাক ওবামার সময়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩টি আসন হারিয়েছিল। একইভাবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ছিলেন, তখন ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে অতিরিক্ত ৪০টি আসন পেয়েছিল।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিমধ্যে ব্যাপক ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকশন ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন, যা ২০২২ সালের ৪ কোটি ৬০ লাখের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া এবার ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। অলাভজনক সংস্থা ওপেনসিক্রেটসের হিসাবে প্রচারণায় দল ও প্রার্থীরা খরচ করছেন প্রায় ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের সমর্থনে ইলন মাস্ক একাই ব্যয় করেছেন প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

কংগ্রেসের বাইরে এবার ৫০টির মধ্যে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদে এবং প্রায় সব অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ভোট হচ্ছে। বর্তমানে দেশজুড়ে রাজ্য আইনসভাগুলোর ৫৫ শতাংশ আসন রিপাবলিকানদের এবং ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে রয়েছে। নির্বাচনে কোনো পক্ষ হেরে গেলে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আইনি বিরোধ বা হস্তক্ষেপের চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

—রয়টার্সের প্রতিবেদন অবলম্বনে

এএম