ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ডে ইসরাইলের নতুন আইন; দোষী প্রমাণিত হলে ৯০ দিনে কার্যকর

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট
মধ্যপ্রাচ্য
বিদেশে এখন
0

প্রাণঘাতী হামলা প্রমাণিত হলে ফিলিস্তিনিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান রেখে আইন পাশ করলো ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট। সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। নতুন এ আইনে, ক্ষমা পাওয়ার অধিকারও নেই অপরাধীর। তবে মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প যাবজ্জীবন কারাভোগের বিধান রাখা হয়েছে। নেতানিয়াহু সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

কারাবন্দি ফিলিস্তিনিদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির। তার নির্দেশেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর চরম নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে বেশ কয়েকবার। এবার ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন তৈরি করলেন তিনি। যা কট্টর-ডানপন্থি নেতানিয়াহু সরকারের আরও একটি প্রত্যাশা পূরণ করলো।

প্রাণঘাতী হামলার দায়ে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান রেখে আইন পাস হয়েছে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে। ১২০ আইনপ্রণেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ ৬২ জন আইনপ্রণেতা বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ৪৮ জন। ভোটদানে বিরত থাকেন একজন।

আইন পাসের সঙ্গে সঙ্গে পার্লামেন্টের ভেতরেই উদযাপনে মাতেন সরকারপন্থীরা। ফাঁসির দড়ির আকৃতির পিন পরে নেসেটে উপস্থিত হন বেন গভির। তার মতে, এ আইনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছে ইসরাইল।

আরও পড়ুন:

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গভির বলেন, ‘আজ থেকে প্রত্যেক সন্ত্রাসী জানবে এবং সমগ্র বিশ্ব জানবে, যারা ইসরাইলিদের প্রাণ কেড়ে নেবে, ইসরাইল রাষ্ট্র তাদের প্রাণ কেড়ে নেবে। এই ন্যায়বিচার দৃশ্যমান ও বাস্তবায়িত হওয়া জরুরি ছিল। এখন তা আইনে পরিণত হয়েছে।’

নতুন আইন অনুযায়ী, ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলোপ এবং ইসরাইলিদের হত্যার জন্য দায়ী হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হবে। রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে দায়ীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত তা পিছিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকলে, দায়ী ব্যক্তির ক্ষমা চাওয়ার বিধান নেই। একই অপরাধে ফিলিস্তিনিদের জন্য ফাঁসির বিধান থাকলেও, ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসনের মধ্যে আইনটি পাস নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধী দলের নেতারা আইনটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করছেন। ভোটের আগেই বিলটি বাতিলের আহ্বান জানায় জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ব্রিটেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, পশ্চিম তীরের সামরিক আদালতে বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের ইতিহাসও রয়েছে।

আরও পড়ুন:

ফিলিস্তিনি একজন বলেন, ‘ভেবেছিলাম যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী আমাদের সন্তানরা মুক্তি পাবে। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই।’

ফিলিস্তিনি প্রিজনারস ক্লাবের প্রধান জানান, ইসরাইলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের ধীরে ধীরে হত্যার জন্যই এই আইন।

ফিলিস্তিনি প্রিজনারস ক্লাবের প্রধান আবদুল্লাহ আল জুঘারি বলেন, ‘এই আইন বন্দিদের জন্য একটি বড় হুমকি সৃষ্টি করবে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ গত আড়াই বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে দখলদারিত্ব এবং গণহত্যা চালিয়ে কৌশলে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হচ্ছে। তাদের কারাগারে শতাধিক বন্দিকে এরই মধ্যে মেরে ফেলা হয়েছে।’

এ বিধানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এই আইনের প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইলে হামলার হুমকি দিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ও ইসলামিক জিহাদ। আর জাতিসংঘ বলছে, আইনটিতে সন্ত্রাসবাদীর সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। এতে অনেক নিরীহও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।

ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থার মতে, আইনটি বৈষম্যমূলক। এর মাধ্যমে অধিকৃত পশ্চিম তীরে আগ্রাসন আরও জোরদার করার সুযোগ পেলো ইসরাইলি বাহিনী।

আরও পড়ুন:

ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা বিৎসেলেমের পরিচালক সারিত মাইকেলি বলেন, ‘অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ইসরাইলি ইহুদিদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। তা কেবল ফিলিস্তিনিসের জন্য। এটি বৈষম্যমূলক আইন। ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিচার হবে ভিন্ন আইনে। ফিলিস্তিনিদের হত্যা করলে তাদের কোনো অপরাধের আওতায় ধরা হবে না।’

১৯৫৪ সালে হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করে ইসরাইল। তবে সবশেষ ১৯৬২ সালে নাৎসি গণহত্যায় জড়িত অ্যাডলফ আইখম্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল।

জেআর