আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: যার দীর্ঘ নেতৃত্বে বদলে যায় ইরানের রাজনীতি

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
মধ্যপ্রাচ্য
বিদেশে এখন
0

আধুনিক ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতার নাম আয়াতুল্লাহ আলী হোসেইনি খামেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বপালন কালে হয়ে ওঠেন প্রজাতন্ত্রের নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু; জীবন্ত এক কিংবদন্তীর সাক্ষাৎ পায় বিশ্ব। ৪০ বছরেরও বেশি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছেন সমানে সমানে। গেল ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় প্রাণ হারালেও আজও প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় একতার নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

আমাদের একজন এমন নেতা আছেন, যিনি রাজপ্রাসাদে নয়, মাটির ঘর থেকেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন- ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিয়ে এই গর্ব সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

শৈশব ও বিপ্লব-পূর্ব জীবন

আধুনিক ইরানের কিংবদন্তী এই নেতার জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল, মাশহাদ শহরের এক ধর্মীয় পরিবারে। ছোটবেলায় মাশহাদ ও ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করেন।

কৈশোর পেড়িয়ে যৌবনে পাড়ি দেয়ার সময় ষাট ও সত্তরের দশকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনবিরোধী গোপন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন খামেনি। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, সয়েছেন বহু নির্যাতন।

আরও পড়ুন:

ইসলামি বিপ্লব

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পতন হয় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির। নতুন শাসনব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করেন খামেনি। এসময় ইসলামি বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

১৯৮১ সালে হত্যার চেষ্টা করা হলে বোমা বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাত স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। সেবছরই আগস্টে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজায়ী নিহত হলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন খামেনি।

সর্বোচ্চ নেতা খামেনি

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ছিল ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত আয়াতুল্লাহ মনতাজেরিকে শেষ মুহূর্তে বাতিল করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ খামেনি। শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাশেমি রফসানজানির সঙ্গে মিল হলেও পরে তার সঙ্গে মতোবিরোধে জড়ান আয়াতুল্লাহ।

আরও পড়ুন:

এরপর ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থি মোহাম্মদ খাতামির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক সংস্কার ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রস্তাব খামেনির অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। এরপর ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গ্রিন মুভমেন্ট ছিল খামেনির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় চ্যালেঞ্জ। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের জয়ের কারণে নিজ দেশে বিরোধীতার মুখে পড়েন খামেনি। ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাসা আমিনির মৃত্যু নিয়েও চাপে পড়েন আয়াতুল্লাহ।

পারমাণবিক চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে কৌশল

২০১৩ সালে হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট হলে খামেনি কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেন। অনুমতি দেন পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায়। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় ইরানের সঙ্গে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি। যদিও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসেন।

যদিও এই পুরো সময়ে খামেনির অন্যতম কৌশলগত অর্জন প্রতিরোধ অক্ষ গড়ে তোলা। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক ও আদর্শিক সম্পর্ক তৈরি করেন খামেনি।

আরও পড়ুন:

খামেনির অবসান

এরপর ২০২৩ এর ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসন ও দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ এর ১৩ এপ্রিল ইসরাইলে হামলা চালায় ইরান। এর জেরে ২০২৫ এর জুনের মাঝামাঝি সময়ে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় ইসরাইল।

আর সবশেষে ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর অধীনে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৯ শতাধিক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। এই হামলায়ই প্রাণ যায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির।

এসএস