বর্ষবরণে চারুকলায় চলছে বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি

বর্ষবরণে চারুকলায় প্রস্তুতি
শিল্পাঙ্গন
দেশে এখন
0

বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বরণে সারা দেশে চলছে নানামুখী প্রস্তুতি। পুরনো সব জীর্ণতা ও গ্লানি মুছে চৈত্রের দাবদাহ ও রুক্ষতা পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন নতুন বছরের আগমনী বার্তা। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে এখন চলছে অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ। বৈশাখের প্রথম সকালকে বর্ণিল রূপ দিতে সেখানে দিনরাত এক করে কাজ করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বর্ষবরণ উপলক্ষে এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়াই এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য।

আজ চারুকলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, শোভাযাত্রার জন্য বিশালাকৃতির মোটিফগুলোর কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে একেকটি প্রতীকী অবয়ব।

জয়নুল গ্যালারির সামনে প্রতিবছরের মতো চলছে মাটির সরায় আলপনা আঁকা, জলরঙে গ্রামবাংলার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা, বাঘ, প্যাঁচাসহ নানা কল্পিত চরিত্রের মুখোশ তৈরির কাজ।

এছাড়া অনুষদের বাইরের দেয়ালগুলোতেও রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেশজ সংস্কৃতির নানা চিত্র। নিজেদের তৈরি এসব শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহ করছেন শিক্ষার্থীরা।

আরও পড়ুন:

এবারের শোভাযাত্রায় লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে পাঁচটি প্রধান মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো হলো— লাল ঝুঁটির মোরগ, দোতারা, সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি, শান্তির প্রতীক পায়রা এবং কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেপা ঘোড়া।

গত ৩১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এবারের নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়।

বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত যেসব উপাদান রয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও বর্তমান সময়ে তা সংরক্ষণ করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বর্তমান সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ভোরের আলোয় মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের জানান দেয়, তেমনি এবারের পহেলা বৈশাখে তৈরি করা মোটিফ নতুন জাগরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পীদের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদ ও লোকসংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মোটিফ হিসেবে রাখা হয়েছে দোতারা। আর ঘোড়া ও হাতি বাংলার লোকশিল্প এবং জীবনের গতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করছে।

ঢাবির ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাঈল হোসেন সিয়াম ও প্রিন্টমেকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান শাওন জানান, গত বছরে বিভিন্ন কারণে অনেকেই অংশ না নিলেও এবার শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

চারুকলার শিক্ষার্থী দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের শক্ত বার্তা দিতে চাই।’

বর্ষবরণের কর্মযজ্ঞ দেখতে সাধারণ মানুষও চারুকলায় ভিড় করেছেন। মেয়েকে নিয়ে চারুকলায় আসা ঐশী বলেন, ‘বাঙালির ঐতিহ্য কেমন তার ধারণা দিতেই মেয়েকে চারুকলায় নিয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখছি এমন নির্ভেজাল ও নির্মল আনন্দ সচরাচর অন্য কোথাও মেলে না।’

দর্শনার্থী মল্লিক ওয়াসী উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এবারের নববর্ষের প্রস্তুতিতে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও উদ্যমী অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। আশা করি তাদের প্রয়াসের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব সার্থকভাবে আয়োজন হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রেইনবো নেশনের ভিশন জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন, তা এবারের আয়োজনে বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশি ঐতিহ্য উদযাপনের মাধ্যমে আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে।’

উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সর্বস্তরের জনগণের যে আনন্দ উৎসব হয়, তা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সেটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর মর্যাদা ও গুরুত্ব বেড়েছে বহুগুণ। বৈশাখকে কেন্দ্র করে মেলা, পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি আর বাউল-ভাটিয়ালির সুরে উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হতে প্রহর গুনছে গোটা দেশ।

এসএস